রকিব হাসান
সাত.
জুগরকে অনুসরণ করতে গিয়ে কান্ত হয়ে পড়েছে তিশা। বিরামহীনভাবে ছুটে চলেছে ছেলেটা। অসম্ভব প্রাণশক্তি। কান্ত হওয়ার কোন লণই নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেমন স্বচ্ছন্দ্যে নামছে, উঠছেও ততখানি সহজেই। আজব এক সবুজ দেশ। আকাশে আলোর পরিবর্তন হচ্ছে না, একই রকম মৃদু সবুজ আভা বিকিরণ করে চলেছে, ভুতুড়ে করে রেখেছে সবকিছু। মনে হচ্ছে সবুজ অন্ধকার। খেয়াল করে দেখতে গেলে কেমন মাথা গরম হয়ে যেতে চায়। এমন অদ্ভুত আকাশ! ভাবল তিশা। মনে পড়ল, ওপর দিকে দেখাতে গিয়ে জুগর বলেছিল, স্বপ্নলোকের পর্দা! এতই নিচে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। সরু একটা নালার কাছে এল ওরা। কুলকুল করে বয়ে চলেছে। থামল জুগর। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ইচ্ছে করলে পানি খেয়ে নিতে পারো। তবে তাড়াতাড়ি করবে।’ পানির কিনারে গিয়ে বসল তিশা। ‘পানিটা ভাল?’ জিজ্ঞেস করল ও। ‘ক্রিটাইনে সব পানিই ভালো পানি,’ জুগর জবাব দিল। ‘তাহলে তুমি খাচ্ছ না কেন?’ ‘আমার তৃষ্ণা পায়নি।’ ‘কিন্তু অনেকণ ধরে তো হাঁটছি আমরা।’ ‘মানুষরা অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই কান্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে যায়, আমাদের ক্রিটাইনবাসীর চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি।’ লম্বা কোঁকড়া চুল হাত দিয়ে একপাশে ঠেলে সরাল তিশা। পানির ওপর ঝুঁকল। অঞ্জলি ভরে পানি তুলে মুখে দিল। টলটলে পরিষ্কার তরল। কিছুটা গরম। আর এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ, মধুর মত। তবে সব মিলিয়ে খুব ভাল স্বাদ। পেটে যেতেই দ্রুত শক্তি ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরে, তাজা হয়ে উঠছে। ‘মানুষের বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগটা কিসের?’ জিজ্ঞেস করল ও। নিচ থেকে ওপর দিকে তাকিয়ে জুগরের পায়ের পাতার ওপর চোখ পড়ল। প্রতি পায়ে চারটে করে আঙুল। একটা করে বুড়ো আঙুল, বাকিগুলো ছোট। আর তখনই ল করল, হাতেও চারটে করে আঙুল। একটা করে আঙুল কম থাকায় ওদের অসুবিধে হয় কি না ভাবছে তিশা, এ সময় জবাব দিল জুগর, ‘না, মানুষের প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার।’ ‘আমার আগে আর কোন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার?’ দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘খুব সামান্য সময়ের জন্য।’ ‘কোথায় ওরা এখন? রাজধানী যুহারে?’ ‘না।’ ‘তাহলে কোথায়?’ ‘ঢেঁকুরদের পেটে।’ মুখ কোঁচকাল তিশা। ‘তুমি নিজের চোখে ওদেরকে খেতে দেখেছ?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ওদের সাহায্য করার জন্য কিছু করনি?’ ‘না।’ রেগে গেল তিশা। ‘কেন করনি? বোলো না, ও নিয়ে তোমার কোন মাথাব্যথা ছিল না।’ থমকে গেল জুগর। ‘অনেক বেশি ঢেঁকুর ছিল। একা আমার পে ওদের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব ছিল না।’ ওর কণ্ঠে খুব মৃদু অনুশোচনার ছোঁয়া বোঝা গেল। উঠে দাঁড়াল তিশা। ‘তোমাদের রাজা ব্রোমা ওদের এভাবে খোলামেলা চলতে দিচ্ছেন কেন?’ তীè দৃষ্টিতে তিশার দিকে তাকাল জুগর। ধমকে উঠতে গিয়েও উঠল না। আরেক দিকে চোখ ফেরাল। ‘আমি জানি না,’ মৃদুস্বরে বলল ও। ‘এই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন তুমি? যদি এতই বিপজ্জনক হয়ে থাকে?’ ‘অনেক বেশি প্রশ্ন করো তুমি, তিশা।’ ‘এগুলো ভাল প্রশ্ন। আমার জানা দরকার। এই এলাকায় কিজন্য এসেছ তুমি?’ চিন্তিত দেখাল জুগরকে। ‘এই এলাকাটা নিষিদ্ধ এলাকা। এখানে এসেছি ঢেঁকুরদের নিয়ে গবেষণার জন্য। ওদের জীবনপ্রণালী জানতে চাই।’ ‘কেন?’ ‘ব্রোমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে।’ ‘সেজন্যই তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন ব্রোমা?’ ‘না। আমি আমার নিজের ইচ্ছেয়ই এসেছি।’ ‘ব্রোমার কাছে ঢেঁকুরদের বিষয়ে জানিয়ে তোমার লাভ কি?’ ‘যাতে ওদের বিরুদ্ধে ব্রোমাকে সজাগ করতে পারি। তাহলে ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য সেনাবাহিনী পাঠাবেন ব্রোমা।’ ‘একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না। তোমাকে দেখে আমার চেয়ে বেশি বয়সী মনে হয় না। একজন তরুণকে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এত কথা বলার সুযোগ কি দেবেন রাজা?’ ‘দেবেন। কারণ তিনি আমার চাচা।’ ‘তার মানে তুমি রাজার ভাতিজা?’ ‘হ্যাঁ।’ হাসল তিশা। ‘খুব ভাল। খুশি হলাম।’ ‘খুশি হতে তো বলিনি আমি।’ ‘আমি যে খুশি হয়েছি, এটা শুনে সত্যিই কি ভাল লাগছে না তোমার? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারো? একজন মানুষের মেয়েকে কি এতই অসুন্দর লাগছে তোমার কাছে?’ মাথা নামাল জুগর। ‘তোমার পানি খাওয়া শেষ হয়েছে, তিশা?’ ‘শুধু তিশা বলে ডেকো আমাকে।’ ‘তোমার শেষ হয়েছে?’ ‘হ্যাঁ। কিন্তু এত দ্রুত কি চলতেই হবে তোমাকে? আমি কান্ত হয়ে গেছি।’ ‘রাত নামার আগেই যুহারে ফিরতে হবে আমাদের।’ ‘কী বলছ তুমি? এখন কি রাত নয়?’ মাথা নাড়ল জুগর। ‘না। তোমাদের পৃথিবীতে রাত হতে পারে, তবে আমাদের এই স্বপ্নলোকে এখন দিন। রাতের বেলা কিছুই দেখা যায় না। আর তখনই ঢেঁকুরদের সুযোগ। ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে ওরা।’ কেঁপে উঠল তিশা। ‘এই এলাকায় কি অনেক বেশি ঢেঁকুর আছে?’ থামল জুগর। নাক উঁচু করে বাতাস শুঁকল। ‘হ্যাঁ, অনেক আছে। সবখানেই ছড়িয়ে আছে ওরা। তাড়াতাড়ি করা দরকার আমাদের।’ নালাটার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল ও। সরে এল। ওকে অনুসরণ করল তিশা। আবার একটা কান্তিকর পাহাড় বেয়ে ওঠা। ‘কথা বলব? চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছে না,’ তিশা বলল। ‘অনর্গল বকবক তো করেই চলেছ। নাহ্, তোমার কথার কবল থেকে নিস্তার নেই। ঠিক আছে, বলো, তবে স্বর নামিয়ে, প্লিজ।’ ‘বাহ্, প্লিজ বললে। খুশি হলাম।’ ‘আমি তোমাকে বলেছি, তোমাকে খুশি করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।’ ‘তোমার কথা বিশ্বাস করলাম,’ তিশা বলল। ‘আচ্ছা, ওই যে বললে, ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য- ওরা কি সংখ্যায় খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছে?’ ‘সে-রকমই মনে হলো।’ ‘ওরা দেখতে কেমন? মানে বড়সড় কোনও জন্তুর মত?’ ‘না।’ ‘বুঝিয়ে বলবে, প্লিজ?’ ‘তুমি তো আক্রান্ত হয়েছিলে। ওটাকে দেখনি?’ ‘ভাল করে দেখার সুযোগ পাইনি। মনে হয়ে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।’ ‘কোথা থেকে এসেছে ওরা? অন্য প্রাণীর মত ওদেরও বাচ্চা আছে?’ ভাবল জুগর। তারপর বলল, ‘এটা এক রহস্য। এ নিয়ে যুহারের জ্ঞানী পুরুষ নারীরা অনেক তর্ক করেছে।’ আবার ভাবল ও। মনে হলো কেঁপে উঠল। তারপর বলল, ‘কারও কারও মতে অবচেতন মনের ভয় থেকে ওদের জন্ম।’ ভ্রƒকুটি করল তিশা। ‘তার মানে? তোমার লোকের ওদের সৃষ্টি করে?’ মাথা নাড়ল জুগর। বনের দিকে তাকাল। ‘এখানে এ বিষয়ে আলোচনা করাটা ঠিক হচ্ছে না।’ দ্বিধা করে স্বর নামিয়ে তিশা বলল, ‘বুঝলাম। কৌতূহলটা আসলে বেশি দেখিয়ে ফেলছি।’ ‘ঢেঁকুরদের ব্যাপারে বেশি কৌতূহল ভাল নয় মোটেও।’ ‘মানুষের জন্য?’ ‘সবার জন্য,’ জুগর বলল। ‘ব্রোমা কেমন লোক?’ ‘রাজা আবার কেমন হয়? রাজাদের মতই।’ ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে কেমন?’ ‘এমনভাবে বলছ যেন ব্রোমা একজন মানুষ।’ ‘আসলে কি মানুষের মত?’ ‘না।’ আবার ভ্রƒকুটি করল তিশা। ‘হুঁ। তোমার কি মনে হয়, তিনি আমাকে সাহায্য করবেন?’ ‘না।’ ‘তাহলে তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?’ ‘আমি তো নিতে চাইনি, তুমিই যেতে চাইলে। আবারও বলছিল, আমি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি না।’ ‘তিনি নিশ্চয় জানেন, আবার আমি কিভাবে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব?’ অনিশ্চিত মনে হলো জুগরকে। ‘ব্রোমা অনেক কিছুই জানেন। তবে সবচেয়ে বেশি জানেন, চুপ করে থাকতে।’ তিশা ল করেছে, ব্রোমার কথা বলার সময় স্বর কেমন পাল্টে যায় জুগরের। ‘তোমার চাচার সঙ্গে তোমার তেমন আন্তরিকতা নেই, তাই না?’ ‘আমি তাঁকে কখনও চাচা বলে ডাকি না। আর সবার মতই মহামান্য রাজা বলে ডাকি।’ ‘তোমার সঙ্গে আন্তরিকতা আছে কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম। আছে?’ সামান্য চুপ করে থেকে জবাব দিল জুগর, ‘আমি তাঁর মন বুঝতে পারি না। কেন তিনি ঢেঁকুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন না, তা-ও বুঝি না। আমার আশঙ্কা হচ্ছে...’ থেমে গেল জুগর। ‘তোমার উদ্বেগের কারণ?’ কিন্তু জবাব দিল না জুগর। একনাগাড়ে হেঁটে চলেছে ওরা। আগের চেয়ে গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে জুগর। তাল রেখে চলতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে তিশা। গরম হয়ে গেছে শরীর। দরদর করে ঘামছে। তা-ও যদি পথটা সহজ-সরল হতো। বনের ভেতর দিয়ে গেছে। আঁকাবাঁকা। এবড়ো-থেবড়ো। মুখে বাড়ি খাচ্ছে ডালপালা, চড়াৎ চড়াৎ করে থাপ্পড় মারছে যেন। এড়ানোর জন্য দুই হাত সামনে বাড়িয়ে রাখতে হচ্ছে তিশাকে। অসংখ্য নদী-নালা পেরোল ওরা। মাঝে মাঝে থেমে পানি খাওয়ার জন্য থামল তিশা। তবে সত্যিকারের বিশ্রাম নেয়া যাকে বলে, তা নিতে পারল না। দিনের আলো নিভে গেলে কোন বিপদে পড়বে, সবুজ আলো নেভার পরের অন্ধকারের রূপ কতখানি ভয়ঙ্কর হবে, এই দুশ্চিন্তায় সে নিজেও থামতে চাইল না। উঁচু একটা পাহাড়ের কোলে এসে হঠাৎ থেমে গেল জুগর। নাক তুলে শুঁকতে লাগল। তাড়াতাড়ি ওর পাশে এসে দাঁড়াল তিশা। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো?’ ‘কাছাকাছি রয়েছে ওরা,’ স্বর নামিয়ে জবাব দিল জুগর। ‘ঢেঁকুররা?’ ‘হ্যাঁ। আমাদের পিছু নিয়েছে।’ আতঙ্কিত হয়ে তিশা বলল, ‘তুমি শিওর?’ ‘হ্যাঁ।’ চারপাশে তাকাল জুগর। ‘পাহাড়ের কোলে এভাবে খোলা জায়গায় না থেকে, আড়ালে চলে যাওয়া উচিত আমাদের।’ হাত তুলে একটা গিরিসঙ্কটের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সরু একটা নদী দেখাল ও। ‘ওই নদীটার উজানে একটা গুহা আছে। ওখানে যদি চলে যেতে পারি, তাহলে বাধা দেয়ার সুযোগ পাব। ওটাই আমাদের একমাত্র ভরসা।’ ‘কয়টা ঢেঁকুর আমাদের পিছু নিয়েছে? সেটা বুঝতে পারছ?’ তলোয়ারের হাতল চেপে ধরল জুগর। ‘কম করে এক ডজন।’ শুনে তিশার মনে হলো আবার বেহুঁশ হয়ে যাবে। ‘ওদের ঠেকাবে কী করে? কোন জিনিসকে ভয় পায় ওরা?’ ‘কোন কিছুকেই না,’ জুগরের জবাব। পাহাড়ের উপত্যকা ধরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড় দিল ওরা। ঘন গাছের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে অসুবিধে হচ্ছে তিশার, তা ছাড়া বারবার শিকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ছে। তবে ওর জন্য স্বস্তির ব্যাপার হলো, কিছুতেই ওকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে না জুগর। প্রতিবার পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে হাত ধরে টেনে তুলছে। পেছনে শোনা যাচ্ছে ছুটে আসা অসংখ্য পায়ের শব্দ। ওদের শব্দ শুনতে পাচ্ছে তিশা, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। ব্যাপারটা ওর ভয় আরও বাড়িয়ে দিল। অবশেষে নদীর কিনারে পৌঁছল ওরা। দম ফুরিয়ে গেছে তিশার। তবু থামল না। জুগরের সঙ্গে নদীর উজানের দিকে দৌড়ে চলল। এক জায়গায় এসে ওকে থামিয়ে দিল জুগর। ‘আর দৌড়ে লাভ নেই। দেরি হয়ে গেছে।’ ‘মানে?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল তিশা। বাতাস শুঁকল জুগর। ‘ওরা গুহাটা চেনে। আমাদের উদ্দেশ্য টের পেয়ে শর্টকাটে আগে চলে গেছে। সামনে থেকে এখন হামলা চালাবে আমাদের ওপর।’ মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল তিশা। ‘আমাদের বাঁচার কি কোনই উপায় নেই?’ ভুরু উঁচু করল জুগর। ‘কী হবে, জানি না। রুখে দাঁড়াব। যদি মরতেই হয়, মরার আগে যে ক’টাকে পারি, শেষ করে দেব।’ ‘কিন্তু মরার কথা ভাবি না আমি। আমাকে বাঁচতে হবে।’ পেছনের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল জুগর। বাড়িয়ে দিল তিশার দিকে। অবশেষে ওর চোখে সমবেদনা দেখতে পেল তিশা। ‘প্রথমে লড়াই করবে’, জুগর বলল। ‘যদি দেখো হেরে যাচ্ছ, কোনমতেই আর পারবে না, নিজেকে মেরে ফেলো। কোনমতেই ওদের হাতে ধরা দিয়ো না।’ আতঙ্কিত হয়ে ছুরিটা ঠেলে সরিয়ে দিল তিশা। ‘না,’ দম আটকে আসছে ওর। ‘আমি সেটা করতে পারব না। নিজের জীবন নিজে নিতে পারব না।’ আবার ছুরিটা ওর দিকে ঠেলে দিল জুগর। ‘কিছুতেই ওদের কাছে ধরা দিয়ো না,’ কোমল কণ্ঠে বলল ও। ‘ওরা তোমাকে কি কষ্ট দেবে, কল্পনাই করতে পারবে না। তারচেয়ে মৃত্যু ভাল।’ মতিশা হয়ে মাথা নাড়ল তিশা। সবুজ অন্ধকার বনের ভেতরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ভয় কোথায় উধাও হয়ে গেল তিশার। প্রচণ্ড সাহস যেন জোয়ারের পানির মত প্লাবিত করে দিল মনকে। ‘না, আত্মহত্যা কখনই ভাল নয়,’ হাত বাড়িয়ে ছুরিটা নিতে নিতে বলল ও। ‘আমি ধরাও দেব না। যদি মরতেই হয়, ঢেঁকুরদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মরব।’ এই প্রথম হাসতে দেখা গেল জুগরকে। ‘তুমি একজন সাহসী মানুষ, তিশা।’ তবে এই সাহসী কথা পরের কয়েক মিনিটে তিশাকে কোনই সাহায্য করতে পারল না। বাঁয়ে একটা সবুজ বস্তুপিণ্ড চোখে পড়ল তিশার। পাক খেয়ে সেদিকে ঘুরে গেল জুগর। তীর ছুড়ল। ছোট্ট তীরটা উড়ে গেল গাছের ফাঁক দিয়ে। অন্ত্রভেদী একটা চিৎকার দিয়ে পড়ে গেল দানবটা। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ দিকে আরও দুটো সবুজ দানব উদয় হলো। ভয়ঙ্কর চেহারা। চোখ জ্বলছে আগুনের মত। তীর ছুড়ে একটাকে মেরে ফেলল জুগর। কিন্তু ধনুকে আবার তীর পরানোর আগেই তৃতীয়টা ওদের ধরতে এল। টান দিয়ে তলোয়ার বের করল জুগর। ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দানবটা। চোখের পলকে ঘটে গেল এতগুলো ঘটনা। ছুরি তুলে দানবটার পিঠে বসিয়ে দিতে গেল তিশা। টের পেল, ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা মস্ত আকৃতি। ছুরি বসানো আর হলো না। ঘুরে গিয়ে দেখতে পেল, মস্ত একটা থাবা ওর দিকে ছুটে আসছে। প্রচণ্ড আঘাতে চোখে যেন সর্ষে ফুল দেখতে লাগল ও। মাথাটা মনে হলো ফেটে যাবে। তারপর ঘন অন্ধকার। আট. তৃণা, তরু আর তৈমুরের মনে হলো, আকাশ থেকে নিচে পড়ছে ওরা। রাতের অন্ধকার থেকে সবুজ অন্ধকারে। কিন্তু মাটিতে পড়ে একটুও ব্যথা পেল না। অদ্ভুত ব্যাপার। পড়েই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে সবুজ জানোয়ারটাকে, কিংবা দানবটাকে অনুসরণ করে আলমারির পেছনের সবুজ ফোকর দিয়ে এখানে এসেছে ওরা, ওটাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তাড়াতাড়ি একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে ওটার মাথা ল্য করে ছুড়ে মারল তৃণা। দানবটা হয়তো ভাবল, অনেক হয়েছে, বিশ্রী এই মানুষের মেয়েটা বড়ই খারাপ! জোরে একবার গর্জে ওঠে, ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে হারিয়ে গেল বনের ভেতরে। এটা কিসের বন? কোথায় রয়েছে ওরা? ভাবছে তিনজনেই। অবাক বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। ‘আমরা চলে এসেছি,’ কথাগুলো যেন ছিটকে বেরোল তৈমুরের মুখ থেকে। বিষণœ হয়ে আছে তৃণা। বনটার মতই বিষণ। ‘খুশি হওয়ার মত কোন কারণ দেখছি না এখনও,’ বলল ও। ভালমত পরিবেশটা দেখে নিল তরু, বিশেষ করে আকাশটা। মনে হচ্ছে যেন ঠিক ওদের মাথার ওপরে ঝুলে রয়েছে। সবুজ রঙের মৃদু আলো বিকিরণ করছে। বলল, ‘অন্য এক ডিমেনশনে চলে এসেছি আমরা, কোন সন্দেহ নেই। আশা করি, তিশাও এখানেই এসেছে।’ ‘আর আশা করি,’ তৃণা বলল, ‘ওকে এখনও সবুজ দানবে খেয়ে ফেলেনি।’ ‘তিশার মৃত্যু নিয়ে আমরা কোন কথা বলব না বলে একমত হয়েছিলাম,’ মনে করিয়ে দিল তৈমুর। মাটির দিকে তাকাল তরু। হাত তুলে দেখাল। ‘ওই দেখো, দুই জোড়া পায়ের ছাপ। এক জোড়া তো তিশার বলেই মনে হচ্ছে।’ ছাপের পাশে নরম মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল তৈমুর। ‘দেখো,’ বলল ও, ‘এক জোড়া ছাপের চারটে করে আঙুল।’ তৈমুরের পাশে বসে তরুও ছাপগুলো পরীক্ষা করল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই ছাপ যার, সে পৃথিবীর প্রাণী বলে মনে হচ্ছে না।’ ‘ছাপগুলো কোন দানবের নয় তো?’ তৃণার প্রশ্ন। ‘না,’ পুরু কাচের চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বলল তৈমুর। ‘এই ছাপগুলো প্রায় মানুষের পায়ের মত, শুধু আঙুল একটা কম।’ মাথা ঝাঁকাল তরু। চারপাশে তাকাল। ডান দিকে চলে গেছে ছাপগুলো। নরম কাদামাটি আর ঘাসের মধ্যে বেশ ভালভাবেই ছাপ পড়েছে, তাই অনুসরণ করা কঠিন হবে না। ‘হতে পারে, এখানে এসেই কোনরকম সাহায্য পেয়েছে তিশা।’ ‘পেলেই ভাল,’ তৈমুর বলল। ‘এসেই স্থানীয়দের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে, তিশার স্বভাব,’ তৃণা বলল, ‘ছাপটা তিশারই।’ উঠে দাঁড়াল তরু। ‘ওদের অনুসরণ করা দরকার।’ পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে জ্বালল ও। ভুতুড়ে সবুজ আলোকে ফুঁড়ে বেরোল যেন তীব্র সাদা আলো। ‘ভাগ্যিস সঙ্গে করে এনেছিলাম এটা।’ আজব আকাশের দিকে তাকাল ও। ‘মনে হয় অন্ধকার হয়ে আসছে।’ তৈমুরও উঠে দাঁড়াল। ‘আমাদের কতখানি সামনে আছে, ও কিছু আন্দাজ করতে পারো?’ ‘আমাদের ডিমেনশনের সঙ্গে যদি এখানকার সময়ের মিল থাকে,’ তরু জবাব দিল, ‘তাহলে ধরে নেয়া যেতে পারে, অন্তত দুই ঘণ্টার পথ আগে রয়েছে ওরা।’ ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে তৃণা বলল, ‘একটা ব্যাপারে শিওর, ওর পায়ে জুতো নেই।’ ‘বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দানবের খপ্পরে পড়েছে,’ তৈমুর বলল। ‘জুতো পরার সময়ই পায়নি।’ ‘ভালই লাগবে স্থানীয় ছেলেটার, নিজের সঙ্গে মিল দেখে,’ তৃণা বলল। ‘দুজনেরই খালি পা। একই রকম আদিম।’ ‘ও যে বেঁচে আছে, খুশি হওনি তুমি?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল। ‘হব, তখন, যখন আমরা সবাই মিলে বাড়ি ফিরে যাব,’ তৃণা জবাব দিল। ‘মাথা খাটিয়ে এখানে তো নিয়ে এলে তুমি আর তরু মিলে, এখান থেকে ফিরব কী করে সেটা কিছু ভেবেছ?’ টর্চটা শক্ত করে চেপে ধরল তরু। ‘সেটা পরে ভাবব।’ ‘তার মানে কিভাবে ফিরব, এখনও জানো না। যাক, শুনে বড়ই শান্তি পেলাম,’ বিড়বিড় করল তৃণা। জবাব দিল না তরু। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে চলল। দেখেই বোঝা যায়, লম্বা লম্বা কদমে এগিয়েছে দু’জনে। জোরে হেঁটেছে। ‘মনে হচ্ছে, তিশার গাইড ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে,’ তরু বলল। ‘তার মানে, কোন কিছুকে ভয় পাচ্ছে। সবুজ দানবকেই কি না কে জানে। হয়তো এ রকম আরও দানব আশপাশে রয়েছে।’ ‘তোমার টর্চের আলো দেখে ওগুলো ভয় পেলেই বাঁচি এখন,’ তৈমুর বলল। ‘আমি তা মনে করি না,’ তৃণা বলল। ‘তৈমুর, তোমার লেজার পিস্তলটা আনলে না কেন?’ ‘ভুলে গেছ নাকি?’ তৈমুর বলল। ‘ওটা তো ডাইনি এরিকা মুনের কাছে রয়ে গেছে, হ্যালোউইনের রাতে আমার কাছ থেকে নিয়েছিল।’ ‘জানি,’ তৃণা বলল। ‘ফেরত নাওনি আর?’ ‘চুপ, আস্তে!’ সাবধান করল তরু। ‘জোরে কথা বলে দানবগুলোকে আমাদের উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ো না। হয় আস্তে কথা বলো, নয়তো চুপ থাকো।’ ‘আস্তে বললেও কথা আমাকে বলতেই হবে,’ তৃণা বলল। ‘এটা আমার কাছে শ্বাস নেয়ার মত। কথা বলতে না পারলে বোমার মতো ফেটে যাব আমি। ঘুমের মধ্যেও আমাকে কথা বলতে হয়।’ ‘তাহলে ফিসফিস করে বলো,’ তরু বলল। অনন্তকাল ধরে যেন হেঁটে চলল ওরা। পরের কয়েক ঘণ্টায়, আকাশের সবুজ আলো অনেক কমে গেছে, প্রায় কালোই হয়ে গেছে এখন। তরুর টর্চটা না থাকলে এতণে চলা বন্ধ হয়ে যেত ওদের। তবে ব্যাটারি আর কতণ টিকবে, সেটাই হলো চিন্তা। ‘আসার আগে নতুন ব্যাটারিই ভরেছিলাম,’ তরু বলল। ‘তবে সস্তা ব্যাটারি।’ ‘সস্তা ব্যাটারি বানানো বন্ধ করে দেয়া উচিত,’ তৃণা বলল। ‘এসব কম দামি ব্যাটারি নিয়ে বেরিয়ে কতবার যে আমরা অন্ধকার বিপজ্জনক জায়গায় আটকা পড়েছি!’ আরও একটা পাহাড় বেয়ে চড়ার সময় হাঁপাতে হাঁপাতে তৈমুর বলল, ‘ওরা দু’জন তো অনেক পথ হেঁটেছে।’ মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘আমি এখন শিওর, রাত নামার আগেই কোনও একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে তিশার গাইড।’ থেমে কান পাতল ও। সামনে, নিচে পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটা নালা পেরিয়ে এসেছে ওরা, তবে এখন যেটার শব্দ শুনছে, সেটাকে রীতিমত নদী মনে হলো। ‘এই, তোমরা শুনতে পাচ্ছ?’ ‘পাচ্ছি,’ তৈমুর বলল। ‘পানির শব্দ।’ ‘না,’ হাঁটা থামাল না তরু। ‘বনের মধ্যে অন্য শব্দ হচ্ছে। আমাদের কাছাকাছিই।’ আলো নিভিয়ে দিল ও। গাঢ় অন্ধকার যেন গলা টিপে ধরল ওদের। ‘আরে কী করছ! জ্বালো! জ্বালো!’ হিসিয়ে উঠল তৃণা। ‘!’ সাবধান করল তরু। ‘আলো জ্বেলেও হয়তো ওদের দেখতে পাব না আমরা, তবে আলো থাকলে ওরা আমাদের ঠিকই দেখবে। তারচেয়ে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করা ভাল।’ ‘এ মুহূর্তে একটুও নিরাপদ বোধ করছি না আমি,’ তৃণা বলল। ‘শুনছ?’ ফিসফিস করে বলল তরু। ‘শব্দটা কাছে আসছে।’ ‘আলো জ্বালো,’ মতিশা হয়ে বলল তৃণা। ‘নিশ্চয়ই ওই দানবগুলোর একটা। আলো দেখলে ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে।’ ‘এই একটু আগে না বললে তুমি তা মনে করো না,’ তৈমুর বলল। ‘এখন করি!’ দাঁড়কাকের কর্কশ স্বর বেরোল তৃণার গলা থেকে। ‘চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো,’ ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলল তরু। ‘আমার মনে হয় না ওটা দানবের শব্দ। মনে হচ্ছে, মানুষের পায়ের।’ ‘চার আঙুলওয়ালা মানুষ, না পাঁচ আঙুল?’ উদ্বিগ্নকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তৃণা। ‘পাঁচ আঙুল হলে আমি বেশি খুশি হই।’ ‘ডাক দেব ওকে?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল। ‘না,’ তরু বলল। ‘আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ও। তাই এদিকেই আসছে।’ ‘আমাদের চেঁচানো উচিত, যাতে শুনতে পায়,’ তৃণা বলল। মনে হলো, দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে ওর। অসহ্য হয়ে উঠেছে উত্তেজনা। ‘তিশা হতে পারে,’ তৈমুর বলল। ‘তাহলে ধরে নিতে হবে গত কয়েক ঘণ্টায় গাঢ় অন্ধকারে দেখার মতা অর্জন করেছে ওর চোখ,’ বলল তরু। অপো করতে লাগল ওরা। ঘামছে। ঢিপ ঢিপ করে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড। শব্দটা, যতটা সম্ভব কম শব্দ করে, এগিয়ে আসছে। অবশেষে অন্ধকারে শোনা গেল একটা কণ্ঠ, ‘এই, তোমরা তিনজনে তিশাকে চেনো?’ সাবধানে জবাব দিল তরু, ‘হ্যাঁ, চিনি। আমরা ওর বন্ধু। তুমি কে?’ ‘আমার নাম জুগর। তোমাদের পৃথিবীর সময়ের হিসেবে কয়েক ঘণ্টা আগে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ওর সঙ্গে হেঁটেছি আমি।’ ‘ও এখন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল তরু। ‘তোমার সঙ্গে আছে?’ দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘না। ঢেঁকুররা ওকে ধরে নিয়ে গেছে?’ ‘ঢেঁকুর?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘বিচ্ছিরি ওই সবুজ রঙের শামুকের মত পিচ্ছিল দানবগুলো?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ওদের নাম ঢেঁকুর কেন? সারাণ ঘাড়–ৎ-ঘুড়–ৎ করে ঢেঁকুর তোলে?’ ‘না। কেন ঢেঁকুর নাম রাখা হয়েছে আমি জানি না,’ জুগর জবাব দিল। আবার সামান্য দ্বিধা করে বলল, ‘ভয়ঙ্কর প্রাণী ওরা। তিশা এখন ভীষণ বিপদের মধ্যে রয়েছে। ওদের ক্যাম্পটা দেখেছি আমি। ওকে মুক্ত করার চেষ্টা করব।’ ‘ওকে নিতেই বা দিলে কেন?’ ধমকের সুরে বলল তৃণা। ‘এখন মুক্ত করতে চাও।’ ‘নিচের নদীর ধারে ঢেঁকুররা হামলা করেছিল আমাদের ওপর,’ জুগরের কথায় বিষণœতার ছোঁয়া। ‘একসঙ্গে অনেক ঢেঁকুর। গোটা ছয়েককে মেরে ফেলেছি আমি। লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তিশার দিকে মনোযোগ দিতে পারিনি। ওর চিৎকার শুনে দেখলাম, ঢেঁকুররা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ ‘বানিয়ে গল্প বলার ওস্তাদ তুমি,’ তৃণা বলল। ‘আহ্, তৃণা,’ রুকণ্ঠে বলল তরু, ‘অভদ্রতা কোরো না।’ ‘অভদ্রতা মানে?’ মুখিয়ে উঠল তৃণা। ‘চার পাওয়ালা এই উদ্ভট প্রাণীটা রাত দুপুরে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে বলে কি না আমাদের বন্ধুকে নিয়ে অনেক পথ হেঁটে এসেছে, এখন এসে বলছে ওকে ঢেঁকুর না ঘুড়–ৎ, কারা জানি তুলে নিয়ে গেছে, আর তুমি ওর কথা বিশ্বাস করতে চাইছ। আমরা ওকে চিনি না, জানি না...ও নিজেই ফেকুরদের দলের হয়ে ওদের সহযোগিতা করছে কি না কী করে বুঝব?’ ‘ফেকুর না, ঢেঁকুর,’ শুধরে দিল জুগর। ‘আর আমি ওদের সহযোগিতা করছি না। ওরা আমার জাতশত্র“। তিশাকে উদ্ধারে তোমরা আমাকে সাহায্য করতে না চাইলে নেই, সেটা তোমাদের ব্যাপার। তবে আমি চেষ্টা করবই।’ ‘কেন?’ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল তরু। ‘খুব অল্প সময় আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার। ওর জন্য তোমার জীবনের ঝুঁকি নেবে কেন?’ তৃতীয়বারের মত দ্বিধা করল জুগর। ‘সেটা আমার ব্যাপার। কারণ ও...ও এখন আমার বন্ধু।’ ‘কিভাবে তোমাকে সাহায্য করব আমরা?’ জানতে চাইল তরু। ‘একটু আগে তোমার হাতে একটা শক্তিশালী আলো জ্বলছিল,’ জুগর বলল। ‘ওটা কি তোমার কথা শোনে? তুমি চাইলেই জ্বলে ওঠে?’ ‘হ্যাঁ,’ তরু বলল। ‘খুব ভাল,’ জুগর বলল। ‘ওই আলো ব্যবহার করে ঢেঁকুরদের চমকে দিতে পারব। খুব সামান্য সময়ের জন্যও যদি ওদের তাড়াতে পারি, ক্যাম্পে ঢুকে তিশাকে বের করে আনতে পারব।’ ‘ওকে কি বেঁধে রেখেছে?’ জানতে চাইল তৈমুর। ‘হ্যাঁ। এখান থেকে সামান্য দূরে ওদের ক্যাম্প। মস্ত আগুনের কুণ্ড জ্বেলেছে। তিশাকে জ্যান্ত খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ ‘আমি জানতাম,’ বিড়বিড় করল তৃণা। ‘তোমার সঙ্গে আমরা চুপি চুপি ক্যাম্পে ঢুকে যেতে পারি না?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর। ‘তাহলে বেশি সাহায্য করতে পারতাম।’ ‘না। মানুষের প্রিতা খুব কম। চোখের পলকে তোমাদের ঘিরে ফেলবে ঢেঁকুররা।’ একটু থেমে জুগর বলল, ‘আমার হাত ধরে অন্ধকারে এগোবে তোমরা। আলোটা নিভিয়ে রাখো। আমি যখন বলব, সঙ্গে সঙ্গে জ্বালবে।’ ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না,’ তৃণা বলল। ‘তুমি যে আমাদেরকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছ না, কী করে বুঝব?’ ‘এ মুহূর্তে তোমাকে বিশ্বাস করানোর মত কোন প্রমাণ আমি দিতে পারব না,’ জুগর বলল। ‘হয় এখানে থাকো, নয়তে আমার সঙ্গে এসো। পছন্দটা তোমাদের।’ ‘আমি ওর সঙ্গে যেতে চাই,’ তৈমুর বলল। ‘আমিও,’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল তরুও। ‘দারুণ!’ অন্ধকারে তৃণার মুখ বাঁকানো দেখতে পেল না দু’জনের কেউ। ‘প্রাণীটার মুখটা পর্যন্ত আমরা কেউ দেখিনি এখনও, ওর কথায় বিশ্বাস করে মানুষখেকো ঢেঁকুরদের আস্তানায় যেতে চাইছ।’ সাবধানে জিজ্ঞেস করল জুগর, ‘তোমার নামটা কী, নারী?’ ঝাঁঝিয়ে উঠল তৃণা, ‘ধ্যাত্তোর, বলে কী? নারী! মেয়ে বলতে অসুবিধেটা কী? এই জংলী, আমার নাম তৃণা। কেন, নাম জিজ্ঞেস করছ কেন?’ ‘তিশার চেয়ে তুমি আলাদা।’ ‘আমাকে কি অপমানের চেষ্টা করছ?’ ‘আমি সত্যি কথাটা বললাম,’ জুগর বলল। তৃণাকে থামানোর জন্য তাড়াতাড়ি জুগরের হাত ধরল তৈমুর। তার হাত ধরল তরু। তৃণা ধরল তরুর হাত। তারপর একটা মানব-শিকল তৈরি করে অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল দলটা। একে তো গতি ধীর, তার ওপর তৃণার বকবকানি, বিরক্ত হয়ে গেল জুগর। শেষ পর্যন্ত তৃণাকে ধমক দিল, চুপ করার জন্য। লাভ হলো না। শেষে জুগর ধরেই নিল, তৃণা এসেছে ভিন্ন কোনও ডিমেনশন থেকে; তিশা, তরু কিংবা তৈমুরদের ডিমেনশন নয়। বিড়বিড় করেই চলল তৃণা। একনাগাড়ে গালি দিতে থাকল মানুষখেকো ভয়ানক দানবগুলোকে উদ্দেশ করে। সামনে একটা হলুদ আভা দেখা গেল। খানিকটা এগোতে আরেকটু বাড়ল আভাটা। জুগরের অবয়ব অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল ওরা। ‘আরে, এর কান তো দেখি বিড়ালের কানের মত চোখা!’ তৃণার কণ্ঠে অসন্তোষ। ওকে চুপ থাকতে ইশারা করল জুগর। মানুষেরই মত। অবাক হলো ওরা। ‘ঢেঁকুরদের ক্যাম্পের কাছে চলে এসেছি,’ জুগর বলল। ‘আমি এখন ডান পাশ ঘুরে যাব। তোমাদের যার কাছে আলো আছে সে পা টিপে টিপে যাও সোজাসুজি আগুন ল্য করে। আগুনের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গাছের আড়ালে দাঁড়াবে। একটা শিসের শব্দ শুনতে পাবে। পাখির ডাকের মত। ওটা আমার সঙ্কেত। সঙ্গে সঙ্গে তোমার আলোটাকে জ্বলে উঠে ঢেঁকুরদের মুখে পড়ার আদেশ দেবে। খুব সামান্য সময়ের জন্য চমকে যাবে ওরা। ওই সুযোগে তিশাকে মুক্ত করে নিয়ে আসব আমি।’ ‘আর তারপর ঢেঁকুররা তেড়ে আসবে আমাদের পেছনে,’ তৃণা বলল। ‘সেই সম্ভাবনাই বেশি,’ অস্বীকার করল না জুগর। ‘তবে এভাবে ছাড়া ভয়ঙ্কর মৃত্যু থেকে তিশাকে বাঁচানোর আর কোন উপায় দেখছি না আমি।’ ‘আমার ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেখতে নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে না তোমার,’ তৃণা বলল। ‘জুগর,’ তৈমুর বলল, ‘তোমার কাছে তলোয়ার আর তীর-ধনুক দেখতে পাচ্ছি। একটা অস্ত্র আমাদের দেবে? তরু যখন আলো জ্বালবে, আমি হয়তো তখন হামলা করতে ছুটে আসা কোন ঢেঁকুরকে থামাতে পারব।’ তলোয়ারটা দিতে চাইল জুগর। ‘আমার কাছে একটা ছুরি আছে, তিশাকে দিয়েছিলাম, কিন্তু ঢেঁকুরে ধরার পর হাত থেকে ফেলে দিয়েছিল ও। সেটা দিয়ে ওর বাঁধন কাটতে পারব। যদি ঢেঁকুরকে মারতে চাও, তাহলে সোজা ওর হৃৎপিণ্ডে আঘাত করবে। ওটাই ওদের একমাত্র দুর্বল জায়গা।’ ‘কেন, যদি মাথা কেটে ফেলি?’ তৈমুর জানতে চাইল। ‘তাতে হয়তো গতি কমাতে পারবে, ঠেকাতে পারবে না,’ জুগর বলল। ‘স্বাভাবিক জ্যান্ত প্রাণীর মত নয় ওরা।’ ‘সেটা আমরা আগেই জানি,’ তৃণা বলল। ওদের দিকে তাকিয়ে বলল জুগর, ‘আমাদের সমাজে কাউকে গুড-লাক জানানোর প্রথা নেই, তবে তিশার সঙ্গে কিছুণ থেকে বুঝেছি, এই কুসংস্কারটা তোমাদের ভালমতই আছে। তাই আমি তোমাদের প্রথামতই গুড-লাক জানাচ্ছি। তোমাদের সবাইকে গুড-লাক। নদীর ধারে দেখা হবে আবার।’ ‘তোমাকেও গুড-লাক,’ তৃণা বলল। অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকাল সবাই। তারপর হাঁটতে শুরু করল জুগর। গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল। পা টিপে টিপে সামনে এগোল তরু আর তৈমুর। ওদের পেছনে তৃণা। ‘আমাদের সঙ্গে আসার দরকার নেই তোমার,’ তৈমুর বলল। ‘আহা, যেন এই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকতেই আমার ভাল লাগবে,’ তৃণা জবাব দিল। অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি চলে এল ওরা। ঢেঁকুরদের হই-হট্টগোল কানে এল। ‘তৃণা ঠিকই বলেছে,’ তরু বলল, ‘এখন তোমার লেজার পিস্তলটা থাকলে খুব ভাল হতো।’ ‘এরিকার সঙ্গে আবার দেখা হলে চেয়ে নেব,’ তৈমুর বলল। ঢেঁকুরদের দেখতে পাচ্ছে ওরা। কম করেও দশটা হবে। আগুন ঘিরে নাচছে। ভয়ানক মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে। মনে হলো, আগুনের মাঝখানে চড়ানো বিশাল হাঁড়ির পানি ফোটার অপো করছে। কিছুটা দূরে মাটিতে পড়ে আছে তিশা। একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা। মনে হয়, বেহুঁশ। একটুও নড়ছে না। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে আছে তরুরা তিনজনে। ‘খোদাই জানে বেঁচে আছে কি না,’ ফিসফিস করে বলল তৃণা। ‘জুগর তো বলল, আছে,’ জবাব দিল তৈমুর। ‘এই আগুন কিন্তু যথেষ্ট উজ্জ্বল,’ তরু বলল। ‘এর মধ্যে টর্চের আলো ওদের ওপর কোনও প্রভাব ফেলবে কি না বোঝা যাচ্ছে না।’ ‘তবে সাদা আলো তো ফেলবে,’ তলোয়ারটা উঁচু করে ধরল তৈমুর। যথেষ্ট ভারী। ‘হয়তো এ ধরনের আলো কখনও দেখেনি ওরা।’ ‘আশা করতে দোষ নেই,’ তরু বলল। মৃদু একটা শিসের শব্দ শোনা গেল, পাখির ডাকের মত। এতই মৃদু, গুরুত্ব দিল না ঢেঁকুররা। পরস্পরের দিকে তাকাল তরুরা তিনজনে। তারপর সামনে লাফ দিল তরু। টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল ঢেঁকুরদের মুখে। লাফিয়ে উঠে তৃণাও চেঁচানো শুরু করল, নেকড়ের মত। উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল তরু ও তৈমুর, ভাবছে, পাগল হয়ে গেল কি না। ‘ওরা ভাববে, আমি মায়ানেকড়ে,’ বলেই আবার চোঁচাতে লাগল তৃণা। টর্চের আলো, না তৃণার বিকট চিৎকার, কোনটা যে ঢেঁকুরদের ভয় দেখাল, বোঝা গেল না। একটা মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল আগুনের চারপাশে। তাড়াহুড়া করে সরতে গিয়ে একে অন্যের গায়ের ওপর পড়ল কয়েকটা ঢেঁকুর। ধাক্কা লেগে আগুনের ওপর পড়ল একটা। গায়ে আগুন ধরে যাওয়ায় গলা ফাটিয়ে এমন চেঁচানো শুরু করল, তৃণার চিৎকারও তার কাছে কিছু না। আগুনের কাছ থেকে দূরে গাছের কাছে জুগরকে হাঁটু গেড়ে বসতে দেখা গেল। ছুরি দিয়ে তিশার দড়ি কাটছে। তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেল ঢেঁকুরদের হট্টগোল। তাকিয়ে রইল টর্চের দিকে। এমনকি যে ঢেঁকুরটার গায়ে আগুন ধরেছিল, সে ওটা নিভিয়ে ফেলে চুপ করে আলোর দিকে তাকাল। ভয় কাটিয়ে উঠছে। উদ্বিগ্ন হলো তরুরা তিনজন। ‘এবার পড়ব আসল বিপদে,’ বিড়বিড় করল তৃণা। ধীরে ধীরে যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ঢেঁকুররা। এগোতে শুরু করল তরুদের দিকে। ‘তৃণা,’ তরু জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার লাইটারটা আছে তোমার সঙ্গে?’ ‘আছে। কী করব ওটা দিয়ে?’ জানতে চাইল তৃণা। ‘সিগারেট ধরিয়ে দেব, ডিনার খাওয়ার পর সুখটান দেবে?’ ‘আগুনের ওপর ছুড়ে ফেল,’ তরু বলল। ‘দপ্ করে জ্বলে উঠে বিস্ফোরিত হবে। তাতে হয়তো টর্চের আলোর চেয়ে বেশি ভয় পাবে ঢেঁকুররা।’ টান দিয়ে পোশাকের ভেতর থেকে লাইটারটা বের করে আনল তৃণা। ‘তোমার কথাই যেন ঠিক হয়। জানো এটার দাম কত? কাজ না হলে পুরো টাকাটাই বিফলে যাবে।’ আগুনে লাইটার ছুড়ে ফেলল তৃণা। তিশাকে মুক্ত করে ফেলেছে ওদিকে জুগর। দুই হাতে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বনে ঢুকে গেল। একটা মুহূর্ত সময় নিল। তারপর বিস্ফোরিত হলো লাইটারটা। বেশ জোরাল শব্দ হলো। চমকে দিল ঢেঁকুরদের। টর্চ নিভিয়ে দিয়ে পাক খেয়ে ঘুরে গেল তরু। ‘চলো, পালাই,’ বলেই দৌড়াতে শুরু করল। বাকি দু’জন পিছু নিল ওর। ‘কোথায় যাচ্ছি?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর। ‘নদীর ধারে,’ তরু বলল। ‘ভুলে গেছ, ওখানেই যেতে বলেছে আমাদের জুগর?’ ‘কিন্তু যদি ঢেঁকুররা পিছু নেয়?’ তৃণার প্রশ্ন। ‘তাহলে সারা জীবন ধরে যে ঘটনাটা ঘটা নিয়ে ভয় পাও তুমি, অনবরত আমাদের সাবধান থাকতে বলো, সেটা ঘটবে, আর কখনও বিষয়টা নিয়ে ভয় পেতে হবে না, উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না, কারণ তুমি মরে যাবে,’ জবাব দিল তরু। ‘ঠিক বলেছ,’ একমত হলো তৃণা। তবে ওদের অবাক করে দিয়ে পিছু নিল না ঢেঁকুররা। নদীর ধারে তরুদের দেখা হলো জুগর ও তিশার সঙ্গে। আগে আগে এগোল জুগর। সবাইকে নদী পার করিয়ে নিয়ে এল একটা গুহার কাছে। ওর ধারণা, ওটাতে রাত কাটানো নিরাপদ। তিশা ঠিক হয়ে গেছে। বন্ধুদের দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হলো। ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না আমাকে বাঁচাতে চলে আসবে তোমরা,’ চেঁচিয়ে বলল তিশা। তরু ও তৈমুরের হাত ধরে ঝাঁকাল। তৃণার হাত ধরে ঝাঁকানোর পর ওকে জড়িয়ে ধরল। ‘তুমি কেমন আছো, তৃণা? অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে খুঁজে পেলে কিভাবে তোমরা?’ ‘এর জন্য দিপুকেই ধন্যবাদটা দিতে হবে তোমাকে,’ তৃণা বলল। অবাক হলো তিশা। ‘দিপু?’ ‘সে এক লম্বা ইতিহাস, তিশা,’ তৈমুর বলল। নয়. পরদিন। অন্ধকার, বিষণœ এক সকাল। ঘুম ভাঙতে তিশা দেখল, গুহামুখে বসে পাহারা দিচ্ছে জুগর। ‘রাতে ঘুমাওনি?’ জিজ্ঞেস করল উদ্বিগ্ন তিশা। মৃদু হাসল জুগর। ‘মানুষের মত এত বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না আমাদের।’ হেসে ওর বাহুতে আলতো চাপড় দিল তিশা। ‘থাক থাক, আবার তোমাদের বোলচাল শুরু কোরো না। কিছু কিছু ভদ্রতা শিখেছ অবশেষে।’ তরু আর অন্যদের ঘুমও ভেঙেছে। গুহার বাইরে উঁকি দিল তরু। ‘তোমাদের দিনগুলো খুব অন্ধকার। এ সময় ঢেঁকুরদের আক্রমণ করার সম্ভাবনা আছে?’ ‘আছে,’ জুগর জানাল। ‘তবে বেশি খিদে না পেলে আক্রমণ করে না। এ সময়টা ওদের জন্য অসময়। রাত জাগার পর এখন ওরা ঘুমাচ্ছে। সময় থাকতে থাকতে তাড়াতাড়ি যুহারে চলে যাওয়া উচিত আমাদের।’ ‘ওখানে গিয়ে কী করব?’ বিড়বিড় করল তৃণা। ওর কণ্ঠে বিরক্তি। শক্ত পাথরের মেঝেতে ঘুমিয়ে আরাম পায়নি ও। বিশেষ করে ওর নিজের ঘরের গদি-বালিশ ছাড়া। ‘ব্রোমার সঙ্গে আমাদের দেখা করিয়ে দেবে বলেছে জুগর,’ তিশা বলল। ‘ব্রোমা ক্রিটাইনের রাজা। জুগরের চাচা। জুগর রাজবংশের লোক।’ তিশার কথা পছন্দ হলো না তৃণার। ‘ওই বর্ম লোকটা আমাদের জন্য কী করবে?’ ‘বর্ম না, ব্রোমা,’ শুধরে দিল তিশা। জুগরের দিকে তাকাল। আবার ফিরল তৃণার দিকে। ‘রাজা আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।’ সবাই ল করল তিশার গলায় জোর নেই। আর জুগর মাথা নোয়াল। ‘রাজা কি সত্যি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন, জুগর?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল। মুখ তুলল জুগর। ‘প্রথমে তোমাদেরকে সাহায্য করতে চাইতে হবে তাঁর। সত্যি বলতে কী, আমার সন্দেহ আছে। মানুষদের তিনি পছন্দ করেন না।’ ‘তার মানে পৃথিবী থেকে আরও মানুষ এ ডিমেনশনে এসেছে,’ তরু বলল। ‘হ্যাঁ,’ জুগর বলল। ‘কিভাবে এল?’ জিজ্ঞেস করল তৈমুর। ‘আমার ধারণা, ঢেঁকুররাই তোমাদের পৃথিবী থেকে তাদের ধরে নিয়ে এসেছে। তোমরাও তো ওভাবেই এসেছ, তাই না?’ ‘আমাকে ধরে এনেছে,’ তিশা বলল। ‘আমাদের ধরে আনেনি, তবে ঢেঁকুররা যে পথে যাওয়া-আসা করেছে, সেটা দিয়েই আমরা এসেছি,’ তরু বলল। ‘আমি এখন যা জানতে চাই, তা হলো ঢেঁকুরদের সঙ্গে তোমার চাচার সম্পর্কটা কী? রাতে তিশার কাছে শুনলাম, তোমার চাচা নাকি ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নারাজ।’ ‘কথাটা ঠিকই। তবে কেন চান না, সেটা আমি বুঝতে পারি না,’ জুগর বলল। ‘ওদের সঙ্গে খাতির নেই তো?’ তরুর প্রশ্ন। ‘না,’ জুগর বলল। ‘ঢেঁকুরদের তো দেখলে। সমস্ত প্রাণী জগতের ওরা মহাশত্র“।’ ‘আর কোন শত্র“ আছে তোমার চাচার?’ জানতে চাইল তরু। ‘তুমি তাঁকে রাজা বলছ, কিন্তু এ দেশের সবাই কি তা-ই মনে করে? কোন বিরোধী দল নেই তো?’ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল জুগর। বোঝা গেল, প্রশ্নটা তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ক্রিটাইনের পরে হোমাব্রি নামে একটা করদ রাজ্য আছে, আমার চাচাকে কর দেয়,’ জুগর জানাল। ‘ক্রিটাইনের চেয়ে অনেক ছোট, তবে ওখানকার লোকেরা খুব শক্তিশালী। কিছুদিন থেকেই ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভাল না। এখানে ওখানে খণ্ডযুদ্ধও হয়ে গেছে।’ ‘কী নিয়ে?’ তৈমুরের প্রশ্ন। ‘ওরা আমার চাচাকে রাজা মানতে নারাজ,’ জুগর বলল। ‘পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ব্রোমাকে কর দেবে না।’ ‘হুঁ, বোঝা গেল,’ মাথা দোলাল তৃণা। ‘হোমাব্রির সঙ্গে পুরোপুরি যুদ্ধ লাগলে তোমার চাচার হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?’ জিজ্ঞেস করল তরু। দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর, ‘হ্যাঁ।’ তৈমুরের দিকে তাকাল তরু। উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তৈমুরকে। জুগরের কথায় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। ‘মিত্রবাহিনী হিসেবে ঢেঁকুরদের সাহায্য নিতে চাইছেন না তো তোমার চাচা?’ জিজ্ঞেস করল তরু। জোরে মাথা নাড়ল জুগর। ‘এই দানবদের সাহায্য নিতে চাইবেন কেন তিনি?’ ‘তাহলে এদেরকে ধ্বংস করার কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?’ তরুর প্রশ্ন। ‘মতিশা মানুষেরা অনেক সময় বেপরোয়া কাজ করে থাকে। সব শুনে আমার মনে হচ্ছে, তোমার চাচা কোণঠাসা হয়ে গেছেন। তিশা বলেছে, ঢেঁকুরদের এলাকায় তোমাকে আসতে দিতেও নাকি রাজি ছিলেন না তিনি।’ ‘উদ্বেগটা আসলে আমার নিরাপত্তা নিয়ে,’ জুগর জানাল। জোরে নিঃশ্বাস ফেলল তৈমুর। ‘এ সব আলোচনা আর তর্কাতর্কি কোনও কাজে আসবে বলে মনে হয় না। চলো, আগে যুহারে যাই, তারপর দেখি, কী ঘটে।’ ‘হ্যাঁ,’ তৃণাও তার সঙ্গে একমত। ‘স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমি বাড়ি ফিরতে পারলেই খুশি।’ উঠে দাঁড়াল জুগর। তলোয়ারটা বেল্টে ঢুকিয়ে রাখল। ‘তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।’ ‘আর তাড়াতাড়ি মানে তাড়াতাড়ি,’ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল তিশা। ‘ওর পেছন পেছন দৌড়াতে হবে আমাদের।’ * গুহা থেকে বেরিয়ে তরুদের নিয়ে আবার বনের মধ্যে ঢুকল জুগর। পুরো দুই ঘণ্টা ধরে আগের দিনের মতই অসংখ্য পাহাড়ে উঠল আর নামল। অতিরিক্ত জোরে ছুটে অল্প সময়ের মধ্যেই তরুদের কান্ত করে দিল। তবে অবশেষে শেষ হলো পাহাড়, একটা চওড়া সমতল রাস্তা পাওয়া গেল। দূরে অস্পষ্টভাবে দেখা গেল পাথরে তৈরি বিশাল এক শহর। থেমে গিয়ে হাত তুলল জুগর। ‘ওটাই যুহার।’ ‘ওখানে পৌঁছতে কতণ লাগবে আমাদের?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল। ‘এই গতিতে, আট ঘণ্টা,’ জুগর বলল। ‘তবে রাতের আগেই পৌঁছে যাব। ক্রিটাইনের দিনগুলো পৃথিবীর তুলনায় অনেক লম্বা।’ ‘পৃথিবী সম্পর্কে এত কিছু জানো কিভাবে তুমি?’ তরু জিজ্ঞেস করল। ‘পুরানো বইতে অনেক তথ্য লেখা আছে,’ জুগর বলল। ‘আমরা জানি, পৃথিবী রয়েছে স্বপ্নলোকের পর্দার ওপাশে।’ ‘ওটা কী?’ জানতে চাইল তরু। ‘অবশ্যই আমাদের দুনিয়ার সীমানা,’ তরুর প্রশ্নটায় অবাক হয়েছে জুগর। ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, যেন স্বপ্নলোকের পর্দা শুনেই সব বুঝে ফেলা উচিত ছিল ওদের। আবার জোরে জোরে হাঁটতে লাগল ওরা। ঘণ্টা দুই পরে রাস্তা ধরে একসারি ঘোড়ায় টানা ওয়্যাগন আসতে দেখল। ওগুলোর দিকে দীর্ঘণ তাকিয়ে থাকার পর কথা বলল জুগর। সামনের গাড়িটা উজ্জ্বল সবুজ আর লাল রঙের পতাকা বহন করছে। এতগুলো গাড়ির চাকা আর ঘোড়ার পায়ের আঘাতে অন্ধকার ধুলোর ঝড় উঠেছে যেন। ‘ওটা সেনাপতি মোরাকের পতাকা,’ জুগর বলল। ‘ভাবছি, ওর লোকেরা এখানে কী করছে? অবাকই লাগছে আমার।’ ‘ও কি তোমার চাচার লোক?’ জিজ্ঞেস করল তরু। মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘দু’জনে খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সবচেয়ে বেশি যাদের বিশ্বাস করেন চাচা, সেনাপতি মোরাক তাদের একজন।’ ‘তোমাকে খুঁজতে পাঠানো হয়েছে হয়তো তাকে,’ তরু বলল। ‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ সেনাপতি আমার জন্য বিপজ্জনক?’ ‘আমি বলতে চাইছি, অদ্ভুত কোন কিছু ঘটছে এই এলাকায়।’ ‘সবে এলে এখানে,’ আপত্তি জানাল জুগর, ‘তুমি কী করে জানলে?’ ‘প্রথম কথা, কাল রাতে আমাদের পিছু নেয়নি ঢেঁকুররা,’ তরু বলল। ‘কিন্তু ওরা তো আমাদের ধরে খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল,’ তিশা বলল। ‘হয়তো, শুধু তোমাকে,’ জবাব দিল তরু। ‘কিন্তু আমার ধারণা, জুগরকে ওরা কিছু করত না।’ তিক্তকণ্ঠে জুগর বলল, ‘আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল ঢেঁকুররা। বাঁচার জন্য লড়াই করতে হয়েছে আমাদের।’ ‘তারপরও বেঁচে গেছ,’ তরু বলল। ‘এতগুলো ঢেঁকুরের হাত থেকে এভাবে বেঁচে যাওয়া, ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক?’ বিরক্ত হলো জুগর। ‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ, আমার চাচা ওদের বলে দিয়েছে যাতে আমাকে ছেড়ে দেয়?’ ‘হয়তো,’ তরু বলল। ‘চলো, সেনাপতির সঙ্গে কথা বলি। আমার ধারণা, অনেক মজার কথা শোনাবে আমাদের ও।’ কিন্তু সেনাপতি মোরাকের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলো না ওদের। ওয়্যাগনের মিছিল কাছাকাছি হতেই দেখা গেল বেশির ভাগ গাড়িই চালাচ্ছে ঢেঁকুররা। ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে দানবগুলো। বোকা হয়ে গেল যেন জুগর। ‘এটা...এটা তো হওয়ার কথা নয়!’ সেনাপতি মোরাকের পৌঁছতে দেরি হলো না। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল চোখা কানওয়ালা লম্বা একজন মানুষ, গায়ে টকটকে লাল আলখেল্লা, গলায় ঝোলানো একটা স্ফটিকের পদক। জুগরের সঙ্গে ওর মানুষ বন্ধুদের দেখে খুশি হয়নি, বোঝা গেল। ওরা কারা, জানতে চাইল। ‘এই লোকগুলো বাংলা শিখল কোথায়, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে,’ বিড়বিড় করল তৃণা। ‘মনে হয়, কোনভাবে আমাদের মগজ থেকে বের করে নিচ্ছে,’ তিশা বলল। ‘হয়তো থট রিডিং জানে এরা। কিংবা হয়তো ওরা ওদের ভাষাতেই কথা বলছে, আমরা বাংলায় আমাদের মত করে শুনছি। ভুলে যেয়ো না, অতিপ্রাকৃত জায়গা।’ সবচেয়ে কাছের ঢেঁকুরটার দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল তৃণা। ‘নিশ্চয় মনে মনে এখনও আমাদের মগজ খেতে চাইছে এই দানবগুলো।’ সেনাপতির প্রশ্নের জবাবে সামান্য মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে জুগর বলল, ‘ওরা পৃথিবীর মানুষ। নিষিদ্ধ এলাকায় ওদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ঢেঁকুরদের থাবা থেকে ওদের আমি বাঁচিয়েছি।’ ওয়্যাগনে দাঁড়ানো ঢেঁকুর-চালকটার দিকে তাকাল একবার ও। ‘কিন্তু ওদের তো আমাদের জায়গা থেকে তাড়ানোর কোন লণ দেখতে পাচ্ছি না।’ হাত তুলল সেনাপতি। ‘আজ এখানে যা দেখতে পাবে, তা নিয়ে কোন কথা বলতে পারবে না। তোমার চাচার আদেশ।’ শুনে ভাল লাগল না জুগরের। ‘তার মানে এই দানবগুলোর সঙ্গে যে হাত মিলিয়েছেন, দেখেও নীরব থাকতে হবে আমাকে? এই বন্ধুত্বের তো কোন কারণ দেখতে পাচ্ছি না। দেশের লোককে অবশ্যই জানানো উচিত। আপনি জানেন, সুযোগ পাওয়ামাত্র এই দানবগুলো আমাদের ধরে খেয়ে ফেলবে।’ পাতলা হাসি ফুটল সেনাপতির ঠোঁটে। ‘এখন অন্তত খাবে না। কিছু সময়ের জন্য আমাদের মিত্র হয়েছে ওরা, হোমাব্রিদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য। ওরা তোমার চাচাকে সিংহাসন খোয়ানো থেকে রা করবে, ওদের কাছে এর বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই আমাদের।’ ‘তারপর যুদ্ধটা যখন শেষ হয়ে যাবে?’ জুগরের প্রশ্ন। ‘ঢেঁকুররা তখন কী করবে? ওদের সহযোগিতার বিনিময়ে কী পুরস্কার চাইবে ওরা? কতজনকে খেতে চাইবে?’ জোরে হাত নেড়ে জুগরকে থামিয়ে দিল সেনাপতি। ‘যাও, তোমার বন্ধুদের নিয়ে পেছনের ওয়্যাগনটাও ওঠো। তোমাদেরকে এখন যুহারে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজার রায়ের অপো করবে।’ ‘কিন্তু আমি আর আমার বন্ধুরা তো কোন অন্যায় করিনি,’ জুগর বলল। রাগত ভঙ্গিতে একটা ভুরু উঁচু করল সেনাপতি। ‘তাই নাকি? তোমাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও রাজার কথা অমান্য করে নিষিদ্ধ এলাকায় গিয়ে গোপনে নজর রেখেছ।’ ‘আমি তো চাচাকে সাহায্য করার জন্যই তথ্য জোগাড় করতে গিয়েছিলাম,’ জুগর বলল। ‘আর যতখানি জানা প্রয়োজন তারচেয়ে বেশি জেনে ফেলেছ,’ ঝাঁকি দিয়ে ঘাড় ঘোরাল সেনাপতি। মিছিলের শেষ ওয়্যাগনটা দেখিয়ে বলল, ‘যাও, ওঠো। এ নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে।’ গটমট করে গিয়ে আবার গাড়িতে উঠল সেনাপতি। ওর প্রহরীরা সামনে এগিয়ে এল। ওদের হাতে লম্বা লম্বা তলোয়ার। গম্ভীর, থমথমে মুখ। তরুদের নিয়ে যাওয়া হলো শেষ ওয়্যাগনটার কাছে। ওটার চালক একটা ঢেঁকুর। লালা ঝরানো ক্ষুধার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। কখন মগজ বের করে খাবে, সেই অপোয় রয়েছে যেন। তরুর দিকে ফিরে তাকাল জুগর। ‘তোমার কথাই তো দেখছি ঠিক। কী করে বুঝেছিলে?’ ‘শাসকদের চরিত্র আমার ভালমতই জানা,’ জবাব দিল তরু। ‘ওদের বেশির ভাগের কাছেই, দুঃখের বিষয়, একমাত্র মতায় থাকা ছাড়া অন্য কোন কিছুরই কোন গুরুত্ব নেই। আমাদের পৃথিবীতেও ঠিক একই অবস্থা। আর এ কারণেই পথে আসতে আসতে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চেয়েছিলাম।’ জুগরের পিঠে হাত রাখল তৈমুর। ‘আমরা যে বিপদে পড়েছি, তাতে তোমার কোন দোষ নেই। ভুল সময়ে এখানে চলে এসেছি আমরা।’ ‘হ্যাঁ, তা-ই,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল তৃণা। ‘মনে হচ্ছে, আর কোনদিন এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারব না আমরা।’ দশ. পাথরে তৈরি একটা ঠাণ্ডা, অন্ধকার কারাগারে এনে ভরা হলো ওদের। জুগরের ধারণা, ঘরটা মূল প্রাসাদের নিচে। সেনাপতির গার্ডেরা ওদের শেষ ওয়্যাগনটায় ঢুকিয়ে দিয়ে, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। কোন জানালা কিংবা ফাঁকফোকর নেই গাড়িটায়। কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিছুই দেখতে পারেনি ওরা। গাড়ি থামার পর চোখে কাপড় বেঁধে নামানো হলো ওদের। তারপর ধাক্কা দিয়ে এই কারাগারে ফেলে, দরজা বন্ধ করে চলে গেছে গার্ডরা। এখানে একটাই স্বস্তি, সবাই একসঙ্গে রয়েছে, এবং কোনও ঢেঁকুর নেই। উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে মেঝেতে পায়চারি করছে জুগর, পাথরের মেঝেতে বসে বাকিরা সেটা দেখছে। এককোণে দেয়ালের বেশ কিছুটা ওপরে বসানো একটা মশাল জ্বলছে। অতি সামান্য আলো। ওদেরকে কারাগারে এনে রাখার পর এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে। সেইসঙ্গে পিপাসা। ‘এখানে নিশ্চয় কোন রুম সার্ভিস নেই, যাকে ডেকে খাবারের কথা বলতে পারো,’ জুগরকে উদ্দেশ করে বলল তৃণা। ‘আমি বুঝতে পারছি না,’ জুগর বলল, ‘চাচা এখনও আমাদের নিতে পাঠাচ্ছেন না কেন? তাঁর সঙ্গে তাড়াতাড়ি দেখা হওয়া দরকার আমার। তাঁকে বোঝানো দরকার, পুরো বিষয়টাই একটা ভুল বোঝাবুঝি।’ ‘ব্রোমা আজ তোমার সঙ্গে দেখা করবেন না,’ তরু বলল। ‘হয়তো যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কথাই বলবেন না।’ থমকে দাঁড়াল জুগর। ‘অসম্ভব।’ ‘তরু ঠিকই বলেছে,’ তৈমুর বলল। ‘লড়াইটা পুরোদমে চলার পর তোমাদের দল জিততে আরম্ভ না করা পর্যন্ত নিজের গোপন কথা ফাঁস করবেন না রাজা। কারণ কেবল তখনই ঢেঁকুরদের সঙ্গে মিত্রতা করার সুফলটা দেখতে পাবেন তিনি।’ কান্ত মনে হলো জুগরকে। ‘নাহ্, তোমরা মানুষেরা, মাথা গরম করে দেয়ার ওস্তাদ।’ অবশেষে বসল জুগর। ‘এই যে, যে বাংলাদেশটার কথা বলছ তোমরা, সেটা কি পৃথিবী দেশটার মহান রাজধানী?’ ‘এখনও হয়নি, তবে কোনও একদিন হবে,’ জবাব দিল তৃণা। জুগরকে বলল তিশা, ‘এখানে যা ঘটছে, তার জন্য আমাদের সত্যি খারাপ লাগছে, জুগর, কিন্তু আমাদেরকে আমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতেই হবে। নইলে তারা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা করবে।’ ‘তোমাদের জন্য আমারও খারাপ লাগছে,’ জুগর বলল। ‘তোমাদেরকে কিভাবে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে, আমি জানি না। তবে একটা কথা ঠিক, এ মুহূর্তে তোমাদেরকে কোনরকম সাহায্য করবে না আমার চাচা।’ ‘তোমার সেই কথাটা নিয়ে এখনও ভাবছি আমি,’ তিশা বলল। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা। তুমি বলেছ, ওটা তোমাদের দুনিয়াকে ঢেকে রেখেছে। এ কথা বলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছ?’ ওপর দিকে হাত তুলল জুগর। ‘ওপরেই আছে ওটা। সব কিছুকে ঢেকে রেখেছে।’ সামনে ঝুঁকল তরু। ‘ওপর দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছ। এর মানেটা কি, আকাশ বোঝাচ্ছ?’ ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। স্বপ্নলোকের পর্দা। অন্য পৃথিবী থেকে আমাদের আলাদা করে রেখেছে। তোমাদের পৃথিবীতেও নিশ্চয় এমন পর্দা আছে?’ ‘নাহ্, ঠিক এমন নয়,’ বলে তৈমুর ও তৃণার দিকে ঘুরে তাকাল তরু। ‘দিপুর আলমারির ভেতর দিয়ে ঢেঁকুরটাকে আমরা তাড়া করে আসার সময় ওই পতনের মত অনুভূতিটার কথা মনে আছে?’ ‘আছে,’ জবাব দিল তৈমুর। ‘আমার মনে হচ্ছিল, নিচে পড়ে হাড়গোড় ভাঙব আমরা।’ মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘সবাই আমরা এমন করে পড়েছি, যেন ওপর থেকে নিচে নেমেছি। হয়তো তা-ই করেছি।’ ‘কী বলছ তোমরা?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে কি আকাশ থেকে পড়েছি বলতে চাইছ?’ চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল তরু, ‘হ্যাঁ।’ হাসল তৃণা। ‘এমন অদ্ভুত কথা এই প্রথম শুনলাম।’ ‘আমারও অবাক লাগছে,’ তরু বলল। ‘এখানকার আকাশটা ভালমত দেখেছি আমি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগবে-খুব বেশি দূরে নয় ওটা।’ ‘কিন্তু আকাশ আকাশই,’ তৃণা বলল। ‘ওটা এক জায়গায় সাঁটা কোনও অটল জিনিস নয়।’ ‘আমাদের পৃথিবীতে নয়,’ তরু বলল। ‘কিন্তু এখানে নিশ্চয় অন্যরকম। জুগর?’ ‘অবশ্যই আকাশটা দেখতে পর্দার মত,’ অবাক হয়ে জুগর বলল। ‘ওটা অটলই আছে। এ ছাড়া আর কিভাবে থাকবে?’ সোজা হয়ে বসল তৈমুর। ‘তরু, তুমি বলতে চাইছ ওই পর্দার ঠিক অন্যপাশেই রয়েছে আমাদের পৃথিবী? তার মানে যদি ওই পর্দার কাছে উঠতে পারি, ওটা ভেদ করে অন্যপাশে গিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারব?’ ‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল তরু। ‘তবে ওপরে উঠে আকাশটাকে কোনভাবে খুলতে হবে। জুগর, এখানে এমন কোন পর্বত আছে, বলতে পারো, যেটার চূড়া ওই পর্দার কাছে পৌঁছেছে?’ ‘নিশ্চয়ই আছে,’ জুগর বলল। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা তো কয়েকটা চূড়ার ওপরই বসে আছে। কাছেই একটা চূড়া আছে, যেটা আকাশ ছুঁয়েছে।’ ‘ভারি অদ্ভুত একটা দেশ,’ বিড়বিড় করল তৃণা। ‘ওই চূড়ার কাছে আমাদের নিয়ে যেতে পারবে?’ তরু জিজ্ঞেস করল। মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘আমার চাচা আমাদের এখান থেকে ছেড়ে দিলেই তোমাদেরকে চূড়াটার কাছে নিয়ে যাব। ঘোড়ার পিঠে চড়ে গেলে খুব বেশিণ লাগবে না। তোমাদের সময়ের হিসেবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা, একেবারেই কম।’ ‘আজকে আর যেতে পারব বলে মনে হয় না,’ ভারি কণ্ঠে বলল তৈমুর। এ সময় কারাগারের দরজায় থাবার শব্দ হলো। লাফিয়ে উঠে তাড়াহুড়া করে ছুটে গেল জুগর। শিক লাগানো চারকোনা ছোট একটা জানালা লাগানো রয়েছে দরজার পাল্লায়, সেখান দিয়ে অন্যপাশে দেখা যায়। হাতে মশাল নিয়ে অন্যপাশের পাথরে তৈরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছোটখাট একটা মূর্তি। ‘ডোরা!’ চেঁচিয়ে বলল জুগর। ‘তুমি এলে কেন?’ ‘ডোরা কে?’ তিশা জানতে চাইল। ফিরে তাকাল জুগর। ‘আমার বন্ধু। আমাদের সাহায্য করতে এসেছে।’ সবাই লাফিয়ে উঠল। দরজার কাছে এসে জড় হলো। বাইরে দাঁড়ানো মেয়েটা জুগরের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি খাটো। চোখা কান দুটো বাদ দিলে যথেষ্ট সুন্দরী। রেশমের মত মসৃণ লম্বা চুলের রঙ সবুজ। পৃথিবীর মানুষদের দেখে অবাক হলো না। কথাবার্তা বেশির ভাগ জুগরের সঙ্গেই বলল। ‘জুগর,’ বিষণœ কণ্ঠে বলল মেয়েটা, ‘খবরটা শুনে আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি, তোমার চাচা তোমাদেরকে জেলখানায় ভরে রেখেছেন। কী করেছিলে, বলো তো?’ ‘কোন অন্যায় করিনি, এটুকু বলতে পারি,’ জুগর জবাব দিল। ‘শুধু জেনে গেছি, ঢেঁকুরদের সঙ্গে চাচা হাত মিলিয়েছে, ওদেরকে মিত্রবাহিনী বানিয়েছে হোমাব্রিদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।’ কুঁকড়ে গেল ডোরা। ‘সত্যি? কিন্তু ওরা তো দানব।’ গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল জুগর। ‘হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি। আমাকে এখানে আটকে রাখার কারণ, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি যাতে বেরোতে না পারি, এই খবরটা জনগণকে জানাতে না পারি। তবে আমার ভয়, ততণে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে ঢেঁকুররা। হয়তো তখন আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের রাজ্য দখল করে নেবে।’ ‘আমি কিছু করতে পারি?’ ডোরা জিজ্ঞেস করল। ‘এখান থেকে আমাদের বেরোনোর ব্যবস্থা করো,’ জুগর বলল। ‘তোমার বাবাকে গিয়ে বলো। তিনি আমাকে চেনেন, আমাকে বিশ্বাস করেন। তাঁকে গিয়ে বলো, আমি নিষিদ্ধ এলাকায় গিয়েছিলাম। ঢেঁকুরদেরসহ গিয়ে ওখান থেকে সেনাপতি মোরাক আমাদের ধরে এনেছে। বলবে, আমার চাচার বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ঢেঁকুরবাহিনী আমাদের সবাইকে খুন করবে।’ তরুদের দিকে তাকাল ডোরা। ভুরু কোঁচকাল। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কিভাবে দেখা হলো?’ ‘সে এক লম্বা কাহিনী, ডোরা, এখন বলার সময় নেই,’ জুগর বলল। ‘তুমি তোমার বাবাকে গিয়ে জানাও, রাজা ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। দেশের মঙ্গলের জন্যই তাঁকে ঠেকানো দরকার। দেশবাসীর কানে খবরটা পৌঁছানো গেলে, তারাই বিদ্রোহ করে রাজাকে ঠেকাবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমাদেরকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করো।’ ‘আমি ভাবছি, দেশের মানুষ বিদ্রোহ করলে রেগে গিয়ে রাজা না শেষে আমাদেরকেই মেরে ফেলেন,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে তরু বলল। ‘তিনি হয়তো ধরে নেবেন, আমরাই যত নষ্টের মূল।’ এগারো. তরুর কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। দুই ঘণ্টা পর জেল থেকে বেরিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পর্বতের দিকে ছুটছে ওরা, পালাচ্ছে বললেই ঠিক হয়, আর প্রচণ্ড রেগে গিয়ে রাজা তাঁর ঢেঁকুরবাহিনী নিয়ে ওদের পিছু নিয়েছেন। মানুষের দৃষ্টিশক্তির বাইরে রয়েছে এখনও দলটা। তবে জুগর তার অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি দিয়ে এখনই দেখতে পাচ্ছে। ঢেঁকুরদের সঙ্গে রাজার মিত্রতার খবরটা নিশ্চয় জানাজানি হয়ে গেছে, তাই জুগরকেই প্রধান বিদ্রোহী ধরে নিয়ে রাজা প্রথমে তাকেই শাস্তি দিতে আসছেন। ডোরা তার কাজটা ঠিকমতই করেছে। ওর বাবা রাজ্যের একজন প্রভাবশালী লোক। নিজের লোক পাঠিয়েছে জেল থেকে জুগর আর তার বন্ধুদের মুক্ত করিয়েছেন। রাজার প্রহরীরা তাদের বাধা দেয়ার সাহস পায়নি। একটা পাহাড়ের কোলে একটুণের জন্য বিশ্রাম নিতে থামলে জুগর বলল, ‘আমি কল্পনাই করিনি, আমার চাচা কোনদিন এভাবে ঢেঁকুরদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন।’ ডোরার পাশাপাশি আরেকটা ঘোড়ায় চড়েছে ডোরা। পর্বতের অর্ধেক পথ চলে এসেছে দলটা। ওপর দিকে তাকাল তরু। পর্বতের চূড়াটাকে যেন ছুঁয়ে আছে সবুজ আকাশ। আর কিছুণের মধ্যেই চূড়ায় উঠে ওরাও ওই আকাশটাকে ছুঁতে পারবে। ‘রাজা পাপ করছেন,’ ডোরা বলল। ‘তাঁকে থামানো দরকার।’ ‘চেষ্টা করব, যদি ঢেঁকুরদের হাত থেকে মুক্তি পাই,’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলল জুগর। ‘কোন না কোন পথ নিশ্চয় আছে,’ তরু বলল। ‘তুমি কিছু ভাবছ?’ তিশা জিজ্ঞেস করল। ‘অনেক কিছুই ভাবছি,’ মাথা ঝাঁকাল তরু। পর্বতের চূড়ার দিকে দেখাল। ‘তবে সেটা কার্যকর করতে হলে ওরা আমাদের ধরে ফেলার আগেই ওখানে পৌঁছুতে হবে।’ ক্রমেই কাছে আসছে রাজা আর তার সেনাবাহিনী। দেশের সেরা ঘোড়াগুলো নিয়ে আসছে, তাই গতিও তরুদের ঘোড়াগুলোর চেয়ে অনেক দ্রুত। পর্বতের ঢাল বেয়ে উঠে চলল তরুরা। ভাগ্য এখন ওদের সহায় হলেই হয়। পর্বতের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে পথ। সেটা বেয়ে উঠতে উঠতে আকাশের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। ওদের মাথার ওপরে মস্ত সবুজ চাদরের মত বিছিয়ে রয়েছে আকাশটা। ঘোড়া থেকে নেমে তাড়াহুড়া করে চূড়ায় উঠে এল ওরা। হাত দিয়ে আকাশের গায়ে গুঁতো দিল। দেখতে নরম দেখালেও পুরু প্লাস্টিকের মত শক্ত, টান টান হয়ে আছে। ‘সত্যিই আজব জায়গা,’ বিড়বিড় করল তৃণা। ‘এটা ভেদ করে ওপাশে যাব কী করে?’ তরুকে জিজ্ঞেস করল তিশা। ‘তা ছাড়া অন্যপাশে কি ফাঁকা জায়গা আছে?’ তৈমুরের প্রশ্ন। ‘হয়তো দেখা যাবে মহাকাশের কালো শূন্যতা ভ্যাকিউয়াম কিনারের মত টান দিয়ে আমাদেরকে নিজের পেটে ভরে ফেলেছে।’ ‘এই আকাশ ভেদ করে যাওয়া যাবে না,’ তরু বলল, ‘যদি এটা নিজে থেকে আমাদের জন্য খুলে না যায়।’ দিগন্তের দিকে তাকাল তৃণা। পৃথিবীর আকাশের মতই বাঁকা হয়ে মাটির দিকে নেমেছে মনে হয়। ‘কী করে খুলব?’ তৃণার প্রশ্ন। ‘আমি তো কোন উপায় দেখতে পাচ্ছি না।’ ‘আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে,’ হঠাৎ বলে উঠল তরু। সেনাবাহিনীর দিকে ফিরে তাকাল তৈমুর। আরও কাছে চলে এসেছে। ঢেঁকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে তৈমুরের মনে হলো, রাজা হয়তো ঠিক করেছেন, তাঁর কাজে বাধা দেয়ার শাস্তি হিসেবে জুগর আর তার বন্ধুদের ধরে ঢেঁকুর দিয়ে খাওয়াবেন। ‘যা করার তাড়াতাড়ি করো,’ তৈমুর বলল। ‘আর বেশি সময় নেই।’ ‘করব,’ শান্তকণ্ঠে তরু বলল, ‘দলবল নিয়ে রাজা এখানে এসে পৌঁছাক, তারপর।’ ‘কী?’ একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল সবাই। হাত তুলল তরু। ‘অস্থির হয়ো না। ঢেঁকুর সমস্যার সমাধান কিভাবে করতে হবে, আমি বুঝে গেছি। চিরকালের জন্য ওদের হাত থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করব।’ ‘কিন্তু ওটা আমাদের সমস্যা নয়,’ তৃণা বলল। ‘আমরা ছোটমানুষ, বড়দের রাজনীতিতে জড়ানোর কি দরকার। সময় থাকতে এখান থেকে কেটে পড়াই ভাল।’ ‘যদি সত্যিই তুমি কিছু করতে পারো, করো, প্লিজ,’ তরুর দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে বলল ডোরা। ‘আমাদের উপকার হবে।’ উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে তিশার দিকে তাকাল জুগর। ‘তোমাদের সাহায্য আমরা অবশ্যই চাই,’ বলল ও। ‘তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেটা করতে বলব না। তোমরা নিরাপদে বাড়ি ফিরে গেছÑএটা দেখলেই বরং আমি বেশি খুশি হব।’ হাসল তরু। ‘ভয় নেই। ঢেঁকুরদেরও পরাজিত করব, একইসঙ্গে বাড়িও ফিরে যাব, তোমাকে কথা দিলাম। আসলে, দুটো ব্যাপারই একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত।’ ‘কিন্তু কিভাবে, সেটা বলো না,’ বুঝতে পারল না তৈমুর। ‘ভেবে দেখো, কিভাবে এখানে এসেছি আমরা,’ তরু বলল। ‘স্পেস-টাইম বা চতুর্থ মাত্রার স্তরকেÑসহজ কথায় বলতে গেলে, সময়ের চাদরকে ছিন্ন করে এখানে চলে এসেছি আমরা। কিসের ওপর ভিত্তি করে? একটা বিশেষ জায়গা সম্পর্কে কেন্দ্রীভূত ভয়। যেটা ঘটেছে দিপুর আলমারিতে। একইভাবে সময়ের আরেকটা ফোকর তৈরি হয়েছিল তিশার আলমারিতেÑওই ভয়ের ওপর ভিত্তি করেইÑযেখান দিয়ে ঢেঁকুরটা ঢুকতে পেরেছিল, ধরে নিয়ে এসেছিল ওকে। এখানে ভয়টাই হলো চাবি। ভয় আমাদেরকে এই স্বপ্নলোকে আটকে রেখেছে। ভয়ই মাথার ওপরের ওই আকাশ সৃষ্টি করেছেÑপুরু, দুর্ভেদ্য একটা পর্দার মত। কিন্তু যদি আমরা আমাদের ভয় ঝেড়ে ফেলতে পারি, আমি শিওর, ওই পর্দা ভেদ করে সহজেই আমাদের জগতে ফিরে যেতে পারব, হয়তো বা পানির ভেতর দিয়ে সাঁতরে চলে যাওয়ার মত করে।’ ‘তাহলে চলো!’ সেনাবাহিনীকে আরও কাছে চলে আসতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল তৃণা। নেতৃত্ব দিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসছেন রাজা। বেল্ট থেকে তলোয়ার খুলে হাতে নিয়েছেন। তাঁর মুখে ফুটে ওঠা রাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঢেঁকুরদের মুখে চওড়া হাসি। এতগুলো মানুষের মগজ খাওয়ার আনন্দেই বোধহয়। ‘কিন্তু ঢেঁকুরদের ঠেকাব কী করে?’ জুগরের প্রশ্ন। ‘সেই একইভাবে,’ জবাব দিল তরু। ‘শুধু একটা কাজই করতে হবে, ওদের ভয় পাওয়া চলবে না। ভয় পেয়ো না ওদের। আমার বিশ্বাস, জুগর, ডোরা, তোমরাই ঢেঁকুরদের জন্মদাতা। তোমাদের ভয়ই এই দানবগুলোকে সৃষ্টি করেছে। প্রচণ্ড দানবের ভয় মনের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। জুগর, ঢেঁকুরদের সম্পর্কে কী বলেছিলে, তিশা আমাকে বলেছে। বলেছিলে : তোমাদের দেশের জ্ঞানী লোকেদের মতে অবচেতন মনের ভয় থেকে ওদের জন্ম। এই সূত্রটাই আমাকে এভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে।’ ‘এখন ওদের ঠেকাব কিভাবে আমরা?’ জুগর জানতে চাইল। ‘দানবের ভয় মন থেকে দূর করো, ওদের দিকে তাকিয়ে হাসো,’ তরু বলল। ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উধাও হয়ে যাবে ওরা।’ ‘তুমি বলতে চাইছ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ওদের তাড়াতে হবে,’ তৃণা বিড়বিড় করল। ‘কিন্তু যদি উধাও না হয়?’ তিশার প্রশ্ন। কাঁধ ঝাঁকাল তরু। ‘তাহলে মরতে হবে।’ জুগর বলল, ‘হয়তো তুমি ঠিকই বলেছে, ঢেঁকুরদের হয়তো পরাজিত করতে পারব আমরা। তবে, বিফল হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। তা ছাড়া এটা আমাদের সমস্যা। তাই বলছি, অকারণ ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে, সময় থাকতে থাকতে এই স্বপ্নলোক থেকে চলে যাও, যদি পারো।’ ‘হ্যাঁ, সেটাই করা উচিত,’ তৃণা বলল। ‘কিন্তু,’ বাধা দিয়ে তৈমুর বলল, ‘বন্ধুদের বিপদের মুখে ফেলে কাপুরুষের মত এভাবে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে চলে যেতে পারব না আমি।’ ‘ঠিক বলেছ, আমিও পারব না,’ বলে জুগর ও ডোরার দিকে তাকাল তিশা। ‘আমাদের বাঁচাতে তোমরা তোমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছ, এখন তোমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করব আমরা। তোমাদের নিরাপদ দেখে তবেই তবেই যাব এখান থেকে।’ ‘যা ভেবেছিলাম, তোমরা মানুষেরা দেখছি তারচেয়ে সাহসী,’ প্রশংসা না করে পারল না জুগর। ‘এবং অনেক বেশি বোকা,’ তৃণা বলল। মিনিটখানেকের মধ্যেই ওদের কাছে পৌঁছে গেল সেনাবাহিনী। ঢেঁকুর প্রহরীর কাঁধে ভর দিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন রাজা ব্রোমা। গটগট করে হেঁটে এলেন জুগরের কাছে। মাথা উঁচু করে তার দিকে এগোল জুগর। সত্যিকারের রাজা মনে হচ্ছে ব্রোমাকে দেখে, যদিও কান দুটো চোখা আর গায়ের রঙ সবুজ। যথেষ্ট লম্বা। পেশিবহুল গঠন। মাথায় রত্নখচিত সোনার মুকুট। রাজার হাতে উদ্যত তলোয়ার। চোখে ঘৃণা। কোন কিছু না বলে আচমকা তলোয়ারটা জুগরের গলায় চেপে ধরলেন। চমকে উঠে সবাই ভাবল, জুগরের গলা কেটে ফেলবেন তিনি। কিন্তু চোখের পাপড়িটাও কাঁপল না জুগরের। চাচার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ভয়লেশহীন চোখে। রাজার দুই পাশে দুটো বিশাল ঢেঁকুরের মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে। ‘নিজের রক্তের সঙ্গে বেইমানি!’ চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা। ‘এখুনি তোমাকে মেরে ফেলে এই বিদ্রোহের অবসান ঘটানো উচিত। এ রকম একটা কাজ কী করে করতে পারলে?’ শান্ত কণ্ঠে জুগর বলল, ‘তুমিই বা নিজের লোকদের সঙ্গে এ রকম কাজ করতে পারলে?’ ‘আমার দেশবাসীকে হোমাব্রিদের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি।’ গলায় এখনও তলোয়ার চেপে ধরা। এই অবস্থায় থেকেই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল ও। ‘দেশবাসীকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত দানবের সঙ্গে হাত মেলাতে হলো? হোমাব্রিরা খেপল কেন, সেটা আগে ভেবে দেখো। যদি তুমি ওদের এত চাপ না দিতে, কর বাড়িয়ে বাড়িয়ে কোণঠাসা করে না ফেলতে, অবাধ্য হতো না ওরা। বিদ্রোহ করত না। লড়াইয়ের দরকারই হতো না তোমার।’ ‘সেটা আমার বিষয়!’ গর্জে উঠলেন রাজা। ‘ওদেরকে যা করতে বলা হয়েছে, সেটা করতে বাধ্য ওরা! যেমন, তোমাকে যা বলা হয়েছিল, করা উচিত ছিল তোমার।’ ‘তা ঠিক, স্বীকার করছি,’ শান্ত রয়েছে জুগর। ‘কিন্তু আমি তোমার ভাতিজা। আমি তোমার ভাল চাই। আমি এখনও মনে করি না, তুমি এতটাই খারাপ হয়ে গেছ যে আমাকে খুন করতেও দ্বিধা করবে না। যতই আমি তোমার তোমার পরিকল্পনায় বাধা দিই না কেন।’ অহঙ্কারী ভঙ্গিতে রাজা বললেন, ‘আমার পরিকল্পনা তুমি ব্যর্থ করতে পারবে না, জুগর।’ ‘পারব,’ জুগর জবাব দিল। রাজার পাশে দাঁড়ানো একটা ঢেঁকুরদের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল ও। বরফের মত জমে গেল যেন ঢেঁকুরগুলো। স্তব্ধ হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আশার সঞ্চার করল তৃণার মনে। আঙুল তুলে বলল, ‘দেখো দেখো, হাসি ওদের ভাল লাগছে না। হাসো, সবাই হাসতে থাকো ওদের দিকে তাকিয়ে।’ ঢেঁকুরদের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। ব্যঙ্গের হাসি। একই সঙ্গে ইয়ার্কি দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। ‘বিচ্ছিরি পিচ্ছিল পোকার দল,’ তৃণা বলল। ‘সবুজ শামুক।’ ‘বোকা জানোয়ার,’ তরু বলল। ‘লালা গড়ানো ভূত,’ বলল তৈমুর। ‘অরুচিকর সঙ্গী,’ বলল তিশা। তিশার দিকে ঘুরল তৃণা। ‘উহুঁ, এত ভদ্র কথায় কাজ হবে না। আরও আগুন ঝরাও।’ বলে তীব্র গালির ফোয়ারা ছোটাল ও। তবে এত গালির আর প্রয়োজন ছিল না। ওদের হাসি আর নির্ভীক ভাবভঙ্গিই কাবু করে দিল ঢেঁকুরদের। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোমের মত গলতে আরম্ভ করল দানবগুলো। দেখতে দেখতে একেবারে একা হয়ে গেলেন রাজা, তাঁর আশপাশে পড়ে রইল শুধু সবুজ রঙের কিছু তরল পদার্থ। বিস্ময়ে বিমূঢ়ের মত চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তিনি। ভয় দেখা গেল চোখে। ‘তোমরা আমার মিত্রবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছ,’ ফিসফিস করে বললেন তিনি। ‘বরং বলুন আপনার আসল শত্র“দের হাত থেকে বাঁচিয়েছি,’ তরু বলল। ‘মহামান্য রাজা, আপনি হোমাব্রিদের ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন না কেন? তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন, কেন কর বাড়িয়েছেন তাদেরকে বোঝান। আমি শিওর, আপনি যুদ্ধের ভাবনা মাথা থেকে বিদেয় করলে ওরাও ভুলে যাবে। যুদ্ধ করার অনেক ঝামেলা, অনেক বিপদ, শেষ পর্যন্ত দুই পকেই তিগ্রস্ত হতে হয়।’ তরুর ভাষণে কাজ হলো। কিংবা হয়তো গার্ডদের গলে যাওয়ার চমকটা কাটিয়ে উঠছেন রাজা। এমন ভঙ্গিতে তরুদের দিকে তাকালেন, যেন এই প্রথম দেখছেন। ওর চোখের রাগ আর ভয় বদলে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল বিস্ময়। ‘হায় হায়, তোমার গলায় তলোয়ার ঠেকিয়েছি আমি, জুগর!’ রাজা বললেন। ‘খুব অন্যায়, খুব অন্যায়। আমাকে মাফ করো। তুমি আমার একমাত্র ভাতিজা।’ মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘আমাকেও মাপ করো, চাচা। তোমার অবাধ্য হয়েছি।’ তরুদের দেখতে লাগলেন রাজা। ‘এরা তোমার বন্ধু, তাই না, জুগর?’ মাথা ঝাঁকাল জুগর। ‘নিষিদ্ধ এলাকায় ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। পৃথিবী থেকে আমাদের রাজ্যে এসেছে আমাদের সাহায্য করার জন্য।’ এর সঙ্গে যোগ করল, ‘পৃথিবীতে ওদেরকে মহান সাব্বির হিসেবে গণ্য করা হয়।’ ‘তা ঠিক নয়,’ প্রতিবাদ করতে গেল তৃণা। মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন রাজা। ‘নিজের চোখেই তো ওদের বীরত্ব দেখলাম। ভীষণ শক্তিমান যোদ্ধা ওরা, শুধু হাসি দিয়েই ঢেঁকুরদের মত ভয়ানক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিল। ওদের পৃথিবীবাসীরাও নিশ্চয় অনেক জ্ঞানী। ওদের অনুসরণের চেষ্টা করব আমি, হোমাব্রিদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করব। বয়স হয়ে গেছে, আমি বুড়ো হচ্ছি, লড়াই করার মতা হারিয়েছি, সেজন্য ঢেঁকুরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম। ওদের সহযোগিতা ছাড়া জিততে পারতাম না।’ একটু থামলেন তিনি। ‘পৃথিবীবাসীদের জিজ্ঞেস করো তো, ওরা আমার রাজ্যে থাকবে কি না, আমার ব্যক্তিগত প্রহরী হবে কি না?’ ‘থাকতে পারলে খুশিই হতাম, মহান রাজা ব্রোমা,’ তিশা বলল। ‘কিন্তু আজ রোববার, আমাদের জরুরি হোমওয়ার্ক আছে, পৃথিবীতে ফিরে সেগুলো শেষ করতে হবে। তবে অন্য কোন সময় আবার আসতে পারি আমরা, বেড়াতে, হোমাব্রিদের সঙ্গে যখন আপনার মিটমাট হয়ে যাবে।’ ‘হ্যাঁ, সেটাই ভাল হবে,’ রাজা বললেন। ‘তোমরা আমার চোখ খুলে দিয়েছ। তোমাদের কাছে আমি ঋণী হয়ে রইলাম। যাও, এখন তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি, যেখানে ইচ্ছে যাও।’ মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল তরু ও তৈমুর। মাত্র কয়েক ফুট দূরত্ব, অথচ মনে হচ্ছে কতদূর। ‘এখন কী করব?’ নিচুস্বরে তরুকে জিজ্ঞেস করল তৈমুর। ‘আত্মবিশ্বাসী হও আর ভয় দূর করো,’ তরু বলল। তারপর মুখের কাছে দুই হাত জড় করে ডাকল, ‘সাব্বির? সালমা? দিপু? ওখানে আছো তোমরা?’ আকাশের অন্য পাশ থেকে সাড়া দিল সাব্বির, ‘হ্যাঁ। তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা কোথায়?’ ‘কাছেই,’ জবাব দিল তরু। ‘তোমরা কি এখনও দিপুর ঘরেই আছো?’ ‘হ্যাঁ। ওর আলমারির ভেতরে বসে আছি। তোমার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আলমারির পেছন থেকে সবুজ আভা বেরোতে শুরু করেছে। তোমাদের কাছে আসার চেষ্টা করব আমরা?’ ‘না,’ তরু বলল। ‘শুধু তোমার হাতটা আলোর ভেতর দিয়ে ঠেলে দাও। আমাদের টেনে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করো।’ ‘ঠিক আছে।’ আকাশের পর্দা ভেদ করে বেরিয়ে এল দুই জোড়া মানুষের হাত। একজোড়া দেখে বোঝা গেল ওগুলো সাব্বিরের, আরেক জোড়া সালমার। দিপুর হাত না দেখে অবাক হলো না ওরা। ও এতই ভিতুর ভিতু, হাত বের করতে ভয় পাচ্ছে। ‘এভাবে মুক্তি পাওয়াটা কেমন অদ্ভুত লাগছে আমার কাছে,’ তৃণা বলল। ‘তবে বেরিয়ে যাওয়াটাই আসল কথা, যেভাবেই হোক। আর বেরোনোর সময় আকাশের মাঝখানে আটকা না পড়লেই খুশি থাকব।’ ‘ওসব নেতিবাচক কথা ভুলেও ভেবো না,’ সাবধান করে দিল তরু। জুগর আর ডোরার সঙ্গে হাত মেলাল তিশা। বলল, ‘এবার গুড-বাই জানাতে হচ্ছে। তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুবই খুশি হয়েছি। তোমাদের কথা চিরকাল মনে থাকবে আমার। ভাল থেকো তোমরা।’ ‘আবার এসো, যত তাড়াতাড়ি পারো,’ আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখল জুগর। ‘তোমাকে মিস করব আমরা,’ ডোরা বলল। ‘আসব, শিগগিরই আসব আবার,’ কথা দিল তিশা। হেসে যোগ করল তরু, ‘তবে তার জন্য ভয় পেতে হবে তোমাকে, ভীষণ ভয়। কোনও রাতে, আলমারির দিকে তাকিয়ে যখন ভয়ে ঘুম আসতে চাইবে না তোমার, তখনই শুধু খুলতে পারবে এখানে আসার পথ।’
Responses 0
Log in to leave a response.