সবুজ শহর · পার্ট 1
সবুজ শহর

রকিব হাসান

সিরিজ
সবুজ শহর
পার্ট 1 এর মধ্যে 3
33% সম্পূর্ণ

    এক.

    চমকে জেগে গেল তিশা। পুরো বেডরুমটাই নীরব, শুধু ওর বুকের ধুকপুকানি ছাড়া আর কোন শব্দ কানে আসছে না। মাথা ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল ও। ভোররাত, তিনটা বাজে। বাইরে অন্ধকার। কেন জেগে গেল, ভাবছে। গভীর ঘুম ঘুমাচ্ছিল। তাহলে জাগল কেন? বালিশে মাথা রেখে পাশ ফিরতে যাবে, এ সময় চোখ পড়ল ওর বড় আলমারিটার দিকে। ভেতর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে বেরোচ্ছে ম্লান সবুজ আভা। বিছানায় উঠে বসে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল ও। আরও অনেক ছেলেমেয়ের মতই তিশাও আলমারির ভেতরের অন্ধকারকে ভয় পায়। বিশেষ করে এখন, নিস্তব্ধ এই রাতের বেলা, আলমারির দরজাটাকে ফাঁক হয়ে থাকতে দেখে। আলমারির ভেতরের অন্ধকারে কী যেন রয়েছে, যেন কোনও ভয়ঙ্কর আতঙ্কপুরীতে ঢোকার প্রবেশপথ ওটা। এই অন্ধকার ঘরটাকেও ভয় পাচ্ছে এখন। ভয় পাচ্ছে বিছানাটাকে। ওর মনে হলো লম্বা কোনও একটা দানবীয় হাত এসে ওর গোড়ালি চেপে ধরে টেনে নিয়ে যাবে বিছানার তলায়। এরপর কী ঘটবে, কী ভয়ঙ্কর ঘটনা, সেটা আর ভাবতে চাইল না। যদিও ওর বয়স এখন বারো, যথেষ্ট বড় হয়েছে, বোঝে, এই ভয় পাওয়াটা অমূলক। ওই আলমারি কিংবা বিছানার নিচে এমন কিছু নেই, যেটা ওর তি করতে পারে। কিন্তু আলমারির ভেতর থেকে যে সত্যিই সবুজ আভা বেরোচ্ছে। দুই চোখ ডলে নিয়ে বিছানায় বসেই সামনে ঝুঁকল তিশা, ভাল করে দেখার জন্য। অদ্ভুত এক ধরনের সবুজ রঙ। ঘাসের মত নয়, গাছের পাতার মত নয়, কেমন গা গোলানো সবুজ। ওর আলমারিতে কোনও আজব প্রাণী নেই তো, যার চামড়ার রঙ কবর থেকে তোলা সবুজ ছত্রাক পড়া পুরনো লাশের মত? উহুঁ, তা নেই! তাহলে ওটা কী? ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করল তিশা। কাছে গিয়ে দেখা ছাড়া জানার আর কোনো উপায় নেই। বিছানা থেকে নেমে আলমারির কাছে হেঁটে যাওয়া ছাড়া। কিন্তু সেটা করতে চায় না ও। অন্তত এ মুহূর্তে। ওর টর্চ লাইটের আলো হতে পারে। আলমারির ভেতর কোনভাবে গড়িয়ে পড়ে, সুইচে চাপ লেগে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু টর্চের আলোর রঙ সবুজ নয়। সবুজ সোয়েটার কিংবা কাপড়ের ভেতর দিয়ে আসতে পারে। সমস্যাটা হলো, সবুজ সোয়েটার নেই ওর। সবুজ একটা শার্ট আছে, তবে সেটাও আলমারিতে নয়, চেস্ট অব ড্রয়ারে রেখেছে। টর্চটাও আলমারিতে রাখেনি। দিন দুই আগে গ্যারেজে পকেট থেকে টাকা পড়ে গিয়েছিল, সেটা খোঁজার জন্য টর্চটা নিয়ে গিয়েছিল, সেখানেই রেখে এসেছে। নাহ্, এই অদ্ভুত আলো অন্য কোন কিছুর! ‘কিসের?’ বিড়বিড় করল আপনমনে। হাত বাড়িয়ে বেডসাইট ল্যাম্পটা জ্বালানোর চেষ্টা করল। কোন কারণে জ্বলল না ওটা। কয়েক মুহূর্ত সুইচটা টিপাটিপি করে হাল ছেড়ে দিল। এমন কী হতে পারে, আলমারির ওই সবুজ জিনিসটাই কোনভাবে জ্বলতে দিচ্ছে না ল্যাম্পটাকে? ব্যাপারটা অসম্ভব, কারণ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ও বিছানায় শোয়ার সময় ওটা জ্বলছিল। বাল্ব্ কেটে গেছে? নাকি ওই সবুজ আভাটাই ল্যাম্পটাকে নিভিয়েছে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে? হয়তো অন্ধকারে থাকতে ভালবাসে ওটা। ওর কাছে কী চায়? ‘কচু চায়,’ জোরে শব্দ করে নিজেকে ধমক লাগাল তিশা। ‘ওটা একটা আলো। জ্যান্ত নয়। আমার তি করতে পারবে না।’ মুখে বললেও মনে মনে কথাটা বিশ্বাস করতে পারল না ও। প্রচণ্ড কৌতূহল দমন করতে পারছে না। যতই ভাবনা-চিন্তা করুক, জানে, নেমে গিয়ে ওটাকে না দেখা পর্যন্ত স্বস্তি পাবে না। শুয়ে লাভ নেই। ওটা কী, না জেনে ঘুমাতেও পারবে না। হয়তো ওর ঘুমানোর সুযোগে সবুজ আলোটা ভয়াল কোনও রাস হয়ে গিয়ে গিলে খাবে ওকে। ওর বন্ধু তৃণার মতে এ ধরনের ঘটনা অসম্ভব নয়। তৃণার এ সব কথা এতদিন উড়িয়ে দিয়েছে তিশা, কিন্তু এ মুহূর্তে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে লাগল। একবার ভাবল, তৃণাকে ফোন করে। কিংবা ওর আরেক বন্ধু, তরুকে। কিন্তু এখন এভাবে ডেকে আনলে ওরা ওকে ভিতু ভাববে। ‘আমি ভিতু নই,’ নিজেকে বলল তিশা। ‘তরু হলে ওটা চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে যেত দেখার জন্য। কোন কিছুকে ভয় পায় না ও।’ তরুকে তাই পছন্দ করে তিশা। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে এল ও। মেঝেটা ঠাণ্ডা। আলমারির দিকে এগোল। গা কাঁপছে। ওর এগোনো টের পেয়েই যেন সবুজ আভার উজ্জ্বলতা কিছুটা বেড়ে গেল। ‘প্লিজ, আমার তি কোরো না,’ আলমারির দিকে এগোতে এগোতে ফিসফিস করে বলল তিশা। দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, সেখান দিয়ে ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। সবুজ আভায় ওর সমস্ত কাপড়ের রঙ সবুজ লাগছে। জুতো, স্যান্ডেল, হ্যাটগুলোও সবুজ। হ্যাট ভালোবাসে তিশা। ওর প্রিয় হ্যাটগুলোর এই বদলে যাওয়া রঙটা ভাল লাগল না। দেখে মনে হচ্ছে, আলমারির সমস্ত জিনিসগুলো যেন ওই সবুজ রঙ শুষে নিয়েছে। আলোটাকে কেমন ঠাণ্ডা, অপার্থিব দেখাচ্ছে। আলোর উৎসটা দেখতে পাচ্ছে না ও। তবে বোঝা যাচ্ছে, আলমারির পেছন থেকে আসছে। ভাল করে দেখতে হলে দরজাটা পুরো খুলতে হবে। সেটা করতে চায় না ও। ভেতরে যে জিনিসটা রয়েছে, বেরিয়ে এসে সেটাকে বেডরুমে ঢোকার সুযোগ দিতে চায় না। ‘কিন্তু ওটা জ্যান্ত নয়,’ নিজেকে বোঝাল আবার তিশা। ‘ওটা আমার কোন তি করতে পারবে না।’ দরজার নব চেপে ধরল তিশা। কাঁপা হাতে, টান দিয়ে আরেকটু ফাঁক করল আলমারির দরজা। নিভে গেল সবুজ আলোটা। টান দিয়ে পাল্লা পুরোটা খুলে ফেলল তিশা। আলমারির ভেতরটা পুরো অন্ধকার। স্বাভাবিকভাবে যা থাকার কথা। ‘হ্যালো?’ ডাকল তিশা, কেমন বোকা বোকা লাগল নিজেকে। কেউ জবাব দিল না। ওর পেছনে, বিছানার পাশে, জ্বলে উঠল ওর ল্যাম্পটা। চমকে গেল ও। ভাগ্যিস, ল্যাম্পের আলোটা সবুজ নয়। আলো জ্বলাতে ভালই হলো। আলমারির ভেতরে ভালমত দেখতে পারল ও। ওর কাপড়, ওর জুতো, ওর হ্যাট, যেখানে যেভাবে রেখেছিল সেভাবেই আছে। তবে কিছু একটা ছিল ভেতরে, যা ওই আলো ছড়াচ্ছিল, ভাবল ও। জিনিসটা কী, বুঝতে পারল না। বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের ঘরে উঁকি দিল ও। মা আর ওর ছোট ভাইটা ঘুমোচ্ছে। ওদের আলমারি খুলে দেখল। ওগুলোতে সবুজ আলো নেই। ফিরে এসে নিজের আলমারিটা দেখল আরেকবার। সবুজ আলো নেই দেখে খুশি হলো। তবে রহস্যটার সমাধান না হওয়াতে খুঁতখুঁতিটা আরও বেড়ে গেল। আলমারির দরজা লাগিয়ে দিল। বিছানায় ফিরে এসে সুইচ টিপে বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল ও। ঘুমিয়ে পড়ল এক সময়। গভীর ঘুমে অচেতন থাকায় টেরই পেল না আবার ঝটকা দিয়ে খুলে গেছে আলমারির দরজা। ফিরে এসেছে সবুজ আভাটা। ঘুমিয়ে থাকায় সবুজ আভার মাঝে ফুটে ওঠা অস্পষ্ট মুখটা দেখতে পেল না তিশা। মুখটা মানুষের মুখ নয়।

    দুই.

    পরদিন শুক্রবার। স্কুল ছুটি। সকাল বেলা ওর প্রিয় রেস্টুরেন্টের দোতলায় বসে নাশতা খাচ্ছে তিশা আর তার বন্ধুরা। কোণের দিকে একটা টেবিলে বসেছে ওরা। এ সময়টায় এখানে বেশি ভিড় হয় না। যত ভিড়, নিচের হলঘরে। এখানে যারা খতে আসে, তাদের বেশির ভাগই ওখানে বসে খায়। সবাই টেবিল ঘিরে বসেছে : তিশা, তরু, তৃণা, তৈমুর, সাব্বির ও সালমা। প্রথম চারজন মিলে একটা দল বানিয়েছে, রহস্যভেদী দল। সবার নামের প্রথম অর ‘ত’ দিয়ে হওয়াতে দলটার নাম দিয়েছে ওরা ‘ত’ বাহিনী। তিশা সুন্দরী, কোঁকড়া কালো চুল। নরম স্বভাবের মেয়ে। তরু খুব সাহসী, বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখার মতা অসাধারণ। তৃণা লম্বা, ছিপছিপে, সে-ও সুন্দরী। সারাণ বকবক করা স্বভাব, কথা না বলে থাকতে পারে না। তৈমুর চুপচাপ থাকে। ক্ষুরধার বুদ্ধি। সাব্বির ‘ত’ বাহিনীর মূল সদস্য নয়, তবে মাঝে মাঝে রহস্য সমাধানে সাহায্য করে। কিছুটা অহঙ্কারী হলেও মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। দলের সবাই ওকে কমবেশি পছন্দ করে। সালমা ওদের দলের একেবারে নতুন সদস্য। মাত্র কিছুদিন আগে অদ্ভুত এক কেসের সমাধান করতে গিয়ে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ‘ত’ বাহিনীর। খুব সুন্দরী। নিজের চেয়ে সুন্দরী মেয়েদের সইতে পারে না তৃণা, কিন্তু সালমার সঙ্গে কোন বিরোধ নেই ওর, মেয়েটার ভালো স্বভাবের জন্য। যা-ই হোক, সবুজ আলোর কথা বন্ধুদের জানাচ্ছে তিশা। ‘মনে হচ্ছিল আলমারির পেছন থেকে আসছে,’ বলল ও। ‘এমন আলো আগে আর কখনও দেখিনি আমি। ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল। তেমন উজ্জ্বল নয়। অদ্ভুতভাবে যেন আমার সমস্ত কাপড় চোপড়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল।’ ভাজা গোশত দিয়ে পরোটা মুখে পুরল তরু। চিবুতে চিবুতে জিজ্ঞেস করল, ‘ঢুকে গিয়েছিল বলে কী বোঝাতে চাইছ?’ ‘মনে হচ্ছিল...যেন ওই রঙে চুবিয়ে তোলা হয়েছে কাপড়গুলোকে,’ তিশা জবাব দিল। আলমারির ভেতরের সমস্ত জিনিসপত্র যেন ওই রঙ শুষে নিয়েছিল।’ ‘কিন্তু সত্যিই কি চোবানো হয়েছে?’ দুধের কার্টনে চুমুক দিল তৈমুর। ‘না,’ তিশা বলল। ‘যেই আমি আলমারির কাছে গিয়ে দরজা খুললাম, আলোটা নিভে গেল। তারপর সব আবার আগের মত স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু বহু খুঁজেও আলোর উৎস কিংবা কারণ কোনটাই জানতে পারিনি। ‘স্বপ্ন দেখেছ,’ তৃণা বলল। ‘স্বপ্ন আর বাস্তবতার তফাৎ আমি বুঝি,’ রেগে উঠল তিশা। ‘এ শহরে স্বপ্ন আর বাস্তবতায় কোন তফাৎও নেই,’ তৃণা বলল। মাথা নাড়ল তিশা। ‘আমি স্বপ্ন দেখিনি। জেগে থেকে নিজের চোখে দেখেছি। জিনিসটা কী, বলো তো তোমরা?’ ‘এ রকম কিছুর কথা আগে কখনও শুনিনি,’ তৈমুর বলল। ‘হয়তো কোনও ধরনের ইন্টারডিমেনশনাল দরজা রয়েছে তোমার ঘরে,’ সাব্বির বলল। ‘আর ওর ঘরটা কিন্তু একেবারেই লাশ রাখার ঘরের মত,’ তৃণা যোগ করল। ‘তোমরা যা বলতে চাইছ, মায়াপথ, তার মত নয় কিন্তু,’ তিশা বলল। এই পথ ধরে বেশ কয়েকবার সময়-ভ্রমণ করে এসেছে ওরা, সময়কে ছাড়িয়ে অন্য সময়ে, অন্য ডিমেনশনে চলে গিয়েছিল। ‘এত শিওর হচ্ছ কী করে?’ সাব্বির জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি বলছ, আলোটার কোন উৎস খুঁজে পাওনি। হয়তো অন্য কোনও ডিমেনশন থেকে আসছিল। তুমি আলমারির দরজাটা খোলার পর কোন কারণে ওই ডিমেনশনের রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’ চিন্তিত দেখাল তিশাকে। ‘তা হতে পারে।’ ‘আলোটার ছোঁয়া কেমন লাগছিল?’ সালমা জিজ্ঞেস করল। পরিবর্তিত জীবনে বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে এখনও ও। তাই কোন মন্তব্য করা কিংবা পরামর্শ দেয়ার চেয়ে দেখা আর শোনাটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে অভিজ্ঞতা থেকে দলের সদস্যরা জেনে গেছে, কোনও ধরনের মতা রয়েছে ওর, যার সাহায্যে অনেক কিছুই টের। আর এই মতাটা হয়তো অতৃপ্ত আত্মার কাছ থেকেই এসেছে, যেটা দুশো বছর ধরে বাসা বেঁধে ছিল ওর দেহে। ওটা চলে যাওয়ার পরেও মতার রেশটা ওর দেহে রয়ে গেছে এখনও। বুঝতে পারলেও কথাটা কেউ ওকে বলে না, কারণ, অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে আলোচনা করতে অস্বস্তি বোধ করে সালমা। ‘কেমন লাগছিল মানে?’ বুঝতে পারল না তিশা। ‘ভাল না মন্দ?’ আবার জিজ্ঞেস করল সালমা। দ্বিধা করল তিশা। ‘ভাল না। কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা...অশুভ।’ মাথা ঝাঁকাল সালমা। ‘আমিও তা-ই ভেবেছি।’ ‘এক সেকেন্ড,’ হাত তুলল তৃণা। ‘আলোর আবার ছোঁয়া লাগে কিভাবে, অশুভ ছোঁয়া?’ ‘হয়তো অশুভ শব্দটা ঠিক হয়নি,’ তিশা বলল। ‘তবে ভাল লাগছিল না, আমি খারাপ বোধ করছিলাম, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওটা যখন চলে গেল আবার ভাল বোধ করতে লাগলাম।’ সামান্য দ্বিধা করে সালমার দিকে তাকাল ও। ‘ওটাকে অশুভ ভাবলে কেন?’ যেন বহুদূরে চলে গেছে সালমার দৃষ্টি, মাঝে মাঝেই এ রকম হয় ওর। ‘আমার মনে হলো, তাই,’ মৃদুকণ্ঠে জবাব দিল সালমা। অস্বস্তির হাসি হাসল তিশা। ‘এখন কিন্তু আমার ভয় লাগছে।’ ‘হয়তো কিছুটা ভয় লাগা ভাল,’ তরু বলল। ‘হয়তো আজ রাতে সালমা কিংবা তৃণা গিয়ে ঘুমাবে তোমার সঙ্গে।’ ‘আমি ওদের বাড়িতে থাকতে রাজি না,’ তৃণা বলল। ‘ঈশ্বরই জানে, আলমারি থেকে সবুজ পেস্টের মত কী বেরোয়।’ ‘আমি পেস্ট বলিনি, বলেছি সবুজ আলো,’ তিশা বলল। ‘যা-ই হোক, আমি তোমার থাকা চাই না।’ এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলল, ‘একাই থাকতে পারব আমি।’ ‘সত্যি পারবে?’ সালমা জিজ্ঞেস করল। ‘তোমার সঙ্গে থাকতে আমার কিন্তু আপত্তি নেই।’ জোর করে হাসল তিশা। ‘না, সামান্য একটা সবুজ আলোকে ভয় পাই না আমি।’ ‘কিন্তু এমনও তো হতে পারে,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে তৈমুর বলল, ‘ওই সামান্য সবুজ আলোটা বড় কিছুর ইঙ্গিত। একটা তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বোমাও খুব মৃদু সবুজ আলো বিচ্ছুরণ করে। কিন্তু ওটার মতা ভেবে দেখো। চোখের পলকে একটা শহর ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। তিশা, তোমার আলমারিটা আমি একবার দেখতে চাই। এখনই।’ উঠে দাঁড়াল তিশা। ‘তাহলে তো খুবই ভাল হয়। এখন নিশ্চয়ই আমার মা আর ভাইটা বাড়িতে নেই, বাজার করতে গেছে। এটাই সুযোগ।’ * তিশার আলমারিটার সামনে এমনভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াল সবাই, ভেতরে উঁকি দিতে লাগল, যেন আজব এক দেশ দেখতে পাবে সেখানে, কিংবা উদ্ভট কিছু। তবে অস্বাভাবিক কোন কিছুই চোখে পড়ল না। আলমারির পেছনটা আর দশটা সাধারণ আলমারির মতই, কাপড়গুলোতেও সবুজ আলোর কোন রেশ নেই। তিশার একটা হ্যাট তুলে নিয়ে মাথায় দিল তৃণা। ‘এই, আমাকে কেমন লাগছে?’ জিজ্ঞেস করল ও। ‘মাথায় দিলেই যখন, এমন আলগা করে রেখেছ কেন? পুরোটা টেনে বসাও,’ সাব্বির বলল। ‘তাহলে তো বোঝা যাবে, কেমন লাগে।’ ভুরু কোঁচকাল তৃণা। ‘অদ্ভুত ব্যাপার, তিশা, আমি কল্পনাই করিনি এতগুলো হ্যাট আছে তোমার।’ ‘হ্যাট সংগ্রহ করা আমার হবি,’ তিশা বলল। আলমারির ভেতর ঢুকল তরু। দেয়ালগুলোতে হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল। ‘নাহ্, গোপন দরজা-টরজা কিছু নেই,’ বলল ও। ‘আমার আঙুলে কিছু ঠেকছে না।’ মাথা ঝাঁকাল তৈমুর। ‘তাতে আশ্বস্ত বা খুশি হওয়ার কিছু নেই। হাতে কিছু না ঠেকাটা বরং আরও বেশি ভয়ের, তাহলে ধরে নিতে হবে সবুজ আলোটার উৎপত্তি ভুতুড়ে কোন কিছু থেকে।’ কুঁকড়ে গেল তিশা। ‘তার মানে তুমি বলতে চাও আমার আলমারিটাতে ভূতের আসর হয়েছে?’ ‘ত-ও বলছি না।’ সালমার দিকে ঘুরল তৈমুর। ‘তোমার কোনও আজব অনুভূতি হচ্ছে এখানে?’ একটা মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সালমা। ‘নাহ্,’ অবশেষে মাথা নাড়ল ও, ‘তবে এখন তো অন্ধকার নয়। রাতে হয়তো কোন পরিবর্তন ঘটে।’ ‘কী ধরনের পরিবর্তন?’ তিশা জানতে চাইল। ‘আসার পথে তুমি বলছিলে, সবুজ আলোটা যতণ আলমারিতে ছিল, তোমার ল্যাম্পটা জ্বলছিল না,’ তরু বলল। ‘আলোটা চলে যেতেই ওটা জ্বলে উঠেছে। সবুজ আলোর সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে।’ ‘হয়তো নাইটলাইট জ্বেলে ঘুমানো উচিত তোমার,’ তৃণা বলল তিশাকে। ‘ফিডারখাওয়া শিশুদের মত।’ ‘ব্যাটারি-চালিত একটা নাইটলাইট লাগালে অবশ্য মন্দ হয় না,’ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব সহকারেই নিল তৈমুর। ‘ব্যাটারি-চালিত কেন?’ তিশার প্রশ্ন। ‘সবুজ আলোটা হয়তো দেয়ালে বসানো সকেটের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করেছিল,’ জবাব দিল তৈমুর। ‘আমার মনে হয়, একটা সাধারণ দুঃস্বপ্নকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা,’ তৃণা বলল। তিশার আরেকটা হ্যাট পরে দেখল। এটা দেখতে গার্ল স্কাউটদের ক্যাপের মত, শুধু প্রতীকটা লাগানো নেই। ‘কিন্তু তুমিই না আমাদের সব সময় জ্ঞান দাওÑঅস্বাভাবিক যে কোন জিনিস থেকে সাবধান থেকো,’ মনে করিয়ে দিল তিশা। ‘বয়স বাড়ছে তো, তাই হয়তো সঠিক চিন্তার মতাও বাড়ছে,’ জবাব দিল তৃণা। ‘তার মানে স্বীকার করছ, এতদিন বেঠিক চিন্তা করেছ...’ তিশা বলল। ওকে কথা শেষ করতে দিল না তরু, ঝগড়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি বাধা দিল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কী করা যায়। আজ রাতে তোমাকে একা থাকতে দেয়াটা ঠিক হবে কি না। তৈমুর, সাব্বির, তোমরা কী বলো?’ ‘আরে না না, লাগবে না,’ সাহস দেখানোর চেষ্টা করল তিশা। ‘আমি একাই থাকব। রাতে যদি আবার আলোটা দেখি, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করব তোমাদের।’ গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘কোরো। তোমার ফোন পেলেই আমি চলে আসব।’

    তিন.

    সে-রাতে ঘুমাতে কষ্ট হলো তিশার। তাতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। পাশের বেডরুমে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মা আর ছোট ভাইটি, তাদেরকে আলোটার কথা মা বলেনি ও, ওদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে চায়নি। ভাবল, আহা, আমিও যদি এভাবে ঘুমাতে পারতাম! তিশার বাবা নেই, মারা গেছেন। বাবার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওর। বার বার আলমারিটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে তিশার। দরজাটা শক্ত করে লাগিয়ে রেখেছে। ডেস্ক চেয়ারটা হাতলের সঙ্গে চেপে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, যাতে আলমারির দরজা খুলে ওর অজান্তে কেউ চলে আসতে না পারে। বোকামিই মনে হচ্ছে ওর, তবে সতর্ক থাকা ভাল, তাতে নিরাপত্তা বাড়ে। কিন্তু কিসের থেকে নিরাপত্তা? একটা নাইটলাইট কিনে নিলেই হতো, আফসোস হচ্ছে এখন। কিছুতেই উত্তেজনা কমাতে পারছে না, ঘুম আর আসবে কী করে। যেই স্নায়ু কিছুটা শান্ত হয়ে আসে, অমনি মনে হয় আলমারির দিক থেকে মৃদু শব্দ শুনেছে, লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে। তবে প্রতিবারেই দেখে, ভুল করেছে। কিন্তু পরেরবারও আবার একই ভুল করা থেকে বিরত থাকতে পারে না।

    উফ্, মরে গেলাম!’ জোরে জোরে বলল ও। ‘সকালবেলা উঠতে পারব না, কান্তিতে ঢুলব, অথচ সারাদিন যা পড়ার চাপ থাকবে!’ ঘড়ির দিকে তাকাল ও। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। একটা প্রায় বাজে। জানালার বাইরে গভীর অন্ধকার। থেকে থেকেই কিসের যেন ঘষা লাগছে কাচে। গাছের ডাল, বুঝতে পারল তিশা, বাতাসে নড়ছে। কম্বলটা চিবুকের কাছে তুলে দিয়ে, আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল ও। ঠিক এই সময় আবার চোখে পড়ল সবুজ আভাটা। আলমারির দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আসছে। বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল তিশা। হাত বাড়াল বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচের দিকে। কিন্তু ল্যাম্পটা জ্বলল না। থাবা দিয়ে তুলে নিল ল্যাম্পের পাশে রাখা টেলিফোনের রিসিভার। কানে ঠেকিয়ে ডায়াল টোন আছে শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু অন্ধকারে তরুর নম্বর টিপতেও সমস্যা হচ্ছে। সবুজ আভাটা আগের রাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর লাগছে। তবে অবশেষে নম্বরগুলো টেপা শেষ করল ও। তৃতীয়বার রিং হতে ঘুমজড়িত কণ্ঠে জবাব দিল তরু, ‘হ্যালো?’ ‘তরু?’ ফিসফিস করে বলল তিশা, ‘ওটা ফিরে এসেছে।’ এক মুহূর্ত পরে জবাব এল, ‘সবুজ আভাটা?’ ‘হ্যাঁ। আমার আলমারিতে।’ ‘তাই!’ ‘আমি এখন কী করব? তুমি কি আসতে পারবে?’ ‘হ্যাঁ, আমি আসছি। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। আমি আসার আগে কিচ্ছু কোরো না। আলমারির কাছে যেয়ো না।’ ‘আর সবাইকে ফোন করব?’ ভেবে দেখল তৈমুর। ‘উহুঁ, দরকার নেই। আমি আগে দেখি।’ ‘ঠিক আছে।’ ‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, তিশা। ওটা শুধু আলো। তোমার কোন তি করতে পারবে না।’ ‘তাহলে ওটার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলছ কেন?’ জবাব দিতে দ্বিধা করল তৈমুর। ‘এই শহরে সাবধান থাকাই ভাল। আমি আসছি।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল তিশা। সবুজ আভাটার দিকে তাকাল। আলমারির দরজা বন্ধ, তবু নিচ দিয়ে যতখানি আসছে, তাতেই উজ্জ্বলতা বেড়েছে বলে মনে হলো ওটার, অন্তত আগের রাতের চেয়ে তো বটেই। তাতে ভয় আরও বেড়ে গেল ওর। অথচ ঘর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কী এক দুর্নিবার আকর্ষণ যেন ঘরের মধ্যেই আটকে রেখেছে ওকে। অসহায় হয়ে আলমারির সামনে পায়চারি করতে লাগল। ওই সবুজ আভাটাই যেন কোনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে ওর ওপর। ওটার কাছে যেতেও ভয় পাচ্ছে, আবার ওটাকে নজরের বাইরে যেতে দিতেও রাজি নয়। মৃদু একটা শব্দ কানে এল ওর। খুব হালকা একটা খসখস শব্দ। আলমারির ভেতর থেকে। দম আটকে ফেলল তিশা। জ্যান্ত হয়ে গেল নাকি ওটা! ক্ষুধার্ত?

    মনের জোর একত্রিত করে, আলমারির কাছে এগিয়ে গেল তিশা। দরজায় চেপে রাখা চেয়ারটা পরীক্ষা করে দেখল জায়গামত আছে কি না। দেহের প্রতিটি পেশি শিহরিত হচ্ছে। আলমারির ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও খুব বেশি শব্দ করছে না ওটা, তবে করছে। দরজায় গা ঘষছে বলে মনে হলো। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ওকে ধরার জন্য। চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল তিশা। ‘জলদি করো, তরু, তাড়াতাড়ি এসো,’ ফিসফিস করে বলল। আলমারির ভেতর জোরাল একটা শব্দ হলো। দড়াম করে দরজার গায়ে আঘাত হানল ওটা। খটখট করে উঠল চেয়ারটা। সেই সঙ্গে যেন নাড়িয়ে দিল ওর সমস্ত স্নায়ু। ‘না!’ আপনিই গোঙানিটা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। আবার দড়াম করে শব্দ হলো। কাত হয়ে পড়ে গেল চেয়ারটা। আতঙ্কে যেন জমে গেল তিশা। দরজার নিচের ফাঁকে সবুজ আভাটা যেন সবুজ আগুনের মত জ্বলছে এখন। ভয়ে চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল তিশার। ‘বাঁচাও! প্লিজ!’ অস্ফুট কান্নার সঙ্গে বেরিয়ে এল কথাগুলো। কিন্তু কেউ ওর কথা শুনল না। কেউ ওকে সাহায্য করতে এল না। ধীরে ধীরে খুলে গেল আলমারির দরজা। আলমারি থেকে বেরিয়ে এল ওটা। ভয়ঙ্কর সেই জিনিসটা। খামচে ধরল ওকে। ওর হাত ধরে টানতে লাগল। চিৎকার করতে চাইল তিশা। স্বর বেরোল না। আলমারির ভেতর ওকে টেনে নিয়ে গেল ওটা। গভীর অন্ধকারে, যেখান থেকে কারও কানে পৌঁছবে না ওর চিৎকার।

    Author
    Electro Thor
    12K Followers

    I love movie, Anime and Reading Story.

    Responses 0

    Log in to leave a response.

    Link copied!