রকিব হাসান
চার.
তিশাদের বাড়িতে পৌঁছল তরু। দরজায় নক করল না। তিশার মা আর ভাইকে জাগিয়ে দেয়ার ভয়ে। এসব অ্যাডভেঞ্চারের কথা বাড়ির কাউকে বলে না দলের কেউ। গোপন রাখে। মা-বাবা শুনলে উদ্বিগ্ন হবেন। ঘরে আটকে রাখতে চাইবেন। পা টিপে টিপে বাড়ির পাশ ঘুরে তিশার বেডরুমের জানালার কাছে চলে এল তরু। আলতো টোকা দিল জানালায়। ঠাণ্ডা রাত। জানালার পাল্লা লাগিয়ে রেখেছে তিশা। মিনিটখানেক অপো করে জবাব না পেয়ে অবাক হলো তরু। আবার টোকা দিয়ে আবার অপো করতে লাগল। অবশেষে, বাইরে থেকেই পাল্লা খোলার চেষ্টা করল। ছিটকানি লাগানো না থাকলে খুলে যাবে। লাগানো নেই। খুলে ফেলল পাল্লা। ভেতরে উঁকি দিয়ে তিশাকে দেখল না। জানালা টপকে ভেতরে ঢুকল। প্রথমেই যেটা চোখে পড়ল তরুর, তা হলো, তিশার আলমারির দরজা হাঁ হয়ে খোলা, আর ডেস্ক চেয়ারটা পড়ে রয়েছে আলমারির কাছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন পাল্লা দিয়ে ধাক্কা মেরে চেয়ারটাকে মাটিতে ফেলা হয়েছে। কোন ধরনের সবুজ আভা দেখা গেল না। ‘তিশা?’ মৃদু স্বরে ডাকল তরু। জবাব নেই। ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এল তরু। বসার ঘর আর রান্নাঘরে দেখল। ছোট বাড়ি। কয়েক মিনিটের মধ্যে খোঁজা শেষ করে ফেলল। তিশার মা আর ভাইয়ের ঘরেও উঁকি দিয়ে দেখল। ওসব জায়গায় থাকার কথা নয়, তবু, যদি থাকে, ভেবেছিল তরু। কিন্তু নেই। আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে তরু। জোর করে তাড়ানোর চেষ্টা করল। আবার তিশার বেডরুমে ফিরে এসে, আলমারিতে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে টর্চ জ্বালল। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ওটা। অস্বাভাবিক বলতে, চেয়ারটাই শুধু উল্টে পড়ে আছে। আলমারির ভেতরের কোন জিনিস নাড়াচাড়া করা হয়নি। কোন কিছু খোয়া গেছে বলেও মনে হচ্ছে না। কাপড়গুলো হ্যাঙারে ঝুলছে। জুতো রাখার জায়গায় সুন্দর করে সারি দিয়ে রাখা জুতো-স্যান্ডেলগুলো। এমনকি হ্যাটগুলোও ঠিক জায়গামত আছে। তৃণা মাথায় দেয়ার পর যেখানকার জিনিস সেখানেই রেখে দিয়েছে। সোজা কথা, আলমারির ভেতর, এমন কোনও চিহ্ন নেই যাতে বোঝা যায় এখানে একটা অপরাধ ঘটানো হয়েছে। অথচ তিশা বলেছিল, সবুজ আভাটা ফিরে এসেছে। আর এখন তো তিশাই নেই। টর্চের আলোয় নম্বর দেখে তৈমুরকে ফোন করল তরু। তৈমুরের জবাব দেয়ার অপো করার সময় বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচ টিপল। জ্বলে উঠল আলো। তারমানে বিদ্যুতের লাইনে কোন সমস্যা নেই। মোলায়েম হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। দ্বিতীয়বার রিং হতেই রিসিভার তুলল তৈমুর।
‘হ্যালো?’ তৈমুরের গলা শুনে মনে হলো না ঘুম থেকে উঠেছে, যেন জেগেই ছিল। ‘তৈমুর, আমি,’ নিচুস্বরে বলল তরু। ‘আমি এখন তিশার বেডরুমে। দশ মিনিট আগে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল সবুজ আভাটা ফিরে এসেছে। সাইকেল নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে চলে এসেছি। এসে দেখি, তিশা উধাও।’ ‘কোথায় গেছে?’ ‘জানি না। তবে কে যেন ওর চেয়ারটা উল্টে ফেলেছে।’ এক মুহূর্ত থেমে বলল তরু, ‘আমার মনে হয়, কোন কিছু বেরিয়ে এসে ওকে ধরে নিয়ে গেছে।’ ‘আলমারির ভেতর থেকে?’ ‘হতে পারে। ভেতর থেকে, কিংবা বাইরে থেকে। কী করব বুঝতে পারছি না। আসবে একবার?’ ‘ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে।’ ‘হ্যাঁ, পেয়েছি,’ স্বীকার করল তরু। ‘আসছি। সাব্বির আর তৃণাকে জানাও। সালমাকেও জানাতে হবে। আমার তো মনে হচ্ছে, এ রহস্যের সমাধান করতে আমাদের সবার মগজ খাটানো দরকার।’ চুপ করে রইল তরু। সালমাকে ভীষণ পছন্দ করে তৈমুর। এর কারণও আছে। কিন্তু তরু সালমাকে এতটা ঘনিষ্ঠভাবে চেনে না, ওদের ভয়ানক বিপজ্জনক জীবনের সঙ্গে মেয়েটাকে জড়ানো ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না। ‘সালমাকে ফোন করব?’ অবশেষে জিজ্ঞেস করল তরু। জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না তৈমুর। ‘ওকে আমি নিজেই জানাচ্ছি। ওর বিশেষ মতাটা এখন কাজে লাগানো আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।’ ‘কিন্তু...’ বলতে গিয়ে থেমে গেল তরু। ‘কিন্তু কী?’ ‘এখন এত রাতে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না। এত তাড়াতাড়ি নিশ্চয় শকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ভূতগ্রস্ত হয়ে থাকার ধাক্কা, দুশো বছর ধরে একটা ভিন্ন আত্মার বশে ছিল ওর দেহটা। ওকে এখানে আনার ঝুঁকিটা নিতে চাও?’ একটা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল তৈমুর। ‘তুমি ওকে বিশ্বাস করো না, তাই না?’ ‘নিশ্চয় করি। কেন করব না?’ ‘এই যে, তুমি বললে, ভূতগ্রস্ত হয়ে ছিল ও।’ ‘আমি ওকে বিশ্বাস করি, তৈমুর, সত্যি। তবে ওকে আমরা ভাল করে চিনি না এখনও, এটা তো ঠিক।’ ‘দেখো, চিনি আর না চিনি, আমার ধারণা, এই রহস্যটাতে ও আমাদের সহযোগিতা করতে পারবে। এখন অন্য কিছু ভাবার চেয়ে তিশার নিরাপত্তার কথাটাই আগে ভাবতে হবে আমাদের, সেটা যেভাবেই আসুক। তাই না?’ ‘হ্যাঁ, তাই,’ বিড়বিড় করল তরু। স্বস্তি পাচ্ছে না। তিশা বেঁচে আছে কি না, সন্দেহ হচ্ছে তার। * আসতে দেরি হলো না ওদের। বিশ মিনিটের মধ্যেই তিশার বেডরুমে জড় হলো সবাই। মজার ব্যাপার হলো, এসবের কিছুই জানতে পারল না একই বাড়িতে থাকা তিশার মা কিংবা ভাই। নিজেদের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। খুব সাবধানে কথা বলছে গোয়েন্দারা, যাতে ওদের কথার শব্দ পাশের ঘরে কারও কানে না যায়। কিছু বলার আগে প্রথমেই আলমারিটা পরীক্ষা করতে গেল সাব্বির ও তৈমুর। কাছেই দাঁড়িয়ে রইল তরু, তৃণা আর সালমা। সবাই গম্ভীর। এমনকি বকবক করা স্বভাবের তৃণাও একেবারে চুপ। ভাল করে দেখে আলমারি থেকে বেরিয়ে এল সাব্বির ও তৈমুর। তরু যা দেখার আগেই দেখেছে। ‘অস্বাভাবিক কোন কিছু দেখলাম না,’ সাব্বির বলল। ‘কোনখান থেকে সবুজ আলোটা তৈরি হয়েছে, তার কোন চিহ্ন নেই,’ বলল তৈমুর। ‘সবুজ আলো নিয়ে কে মাথা ঘামায়,’ তৃণা বলল। ‘আমার প্রশ্ন, তিশা কোথায়?’ ‘মনে হয় আলোটা ওকে নিয়ে গেছে,’ সাব্বির বলল। ‘নিয়ে কী করেছে?’ তৃণার প্রশ্ন। কাঁধ ঝাঁকাল সাব্বির। ‘জ্যান্তই খেয়ে ফেলেছে হয়তো।’ ভারি কণ্ঠে তরু বলল, ‘তিশা বেঁচে আছে ধরে নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। জ্যান্ত খেয়ে ফেলেছে, না মেরে ফেলে দিয়েছে, এসব বলাটা ঠিক হচ্ছে না।’ লজ্জা পেল সাব্বির। মাথা নামিয়ে বলল, ‘আসলে, সম্ভাবনার কথা বলছিলাম আমি। যা-ই হোক, আমিও মনেপ্রাণে চাই, তিশা বেঁচে থাকুক।’ ‘তদন্তের খাতিরে বলি,’ তৈমুর বলল, ‘ধরা যাক, সবুজ আলোটাই ওকে ধরে নিয়ে গেছে। ওকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা অনুমান করার আগে আমাদের জানতে হবে ওই আলো এখানে কেন এসেছিল, তিশার আলমারিতে।’ ‘তিশার আলমারিতে আসার ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয়,’ তৃণা বলল। ‘ওকে হাতের কাছে পেয়েছে, ধরে নিয়ে গেছে। এ ধরনের উদ্ভট ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয় এই শহরে, প্রায়ই ঘটে।’ ‘কিন্তু তাই বলে কোন সূত্রই রেখে যাবে না?’ সাব্বির বলল। ‘ওই আলমারিটার কোনও বিশেষত্বও চোখে পড়েনি আমার, ওটাতে ঢুকল কেন সবুজ আলোটা?’ নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল একবার তরু। কী যেন ভাবল। বিড়বিড় করে আপনমনেই বলল, ‘হয়তো ভুল জিনিসের দিকে নজর দিচ্ছি আমরা। আলমারিটা হয়তো বিষয় নয়, বিষয় হলো তিশা।’ ‘কী বলতে চাও?’ ভুরু নাচাল তৈমুর। ‘আমি শিওর নই...’ সালমার দিকে ঘুরল তরু। ‘সালমা, এমন কিছু টের পাচ্ছ এখানে, বিকেলে যেটা পাওনি?’ স্বচ্ছ নীল চোখজোড়া বন্ধ করল সালমা। একটু পর আবার যখন খুলল, ওকে কিছুটা ফ্যাকাশে মনে হলো। এক পা এগোল আলমারির দিকে। খোলা পাল্লায় হাতের তালু চেপে ধরল। ‘ভয় টের পাচ্ছি আমি,’ ফিসফিস করে বলল সালমা। সালমার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে তরু। ‘কার ভয়? তিশার?’ চোখ বড় করে ওর দিকে তাকাল সালমা। ‘কার ভয় জানি না। শুধুই ভয়। ভয়ে ভিজে আছে জায়গাটা।’ ‘ভয়ে আবার ভিজে থাকে কী করে?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারব না,’ সালমা জবাব দিল। ‘ভিজে আছে, ব্যস।’ ওর আজব নতুন বন্ধুর দিকে তাকাল তৈমুর। ‘তিশা বলেছিল, ওর মনে হচ্ছিল, আলমারির ভেতরের সমস্ত জিনিস যেন সবুজ আলো শুষে নিয়েছে। জিনিসগুলোতে বসে গেছে আলোটা। অন্যভাবে এর ব্যাখ্যা করলে বলা যেতে পারে, সবুজ আলো সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছে।' ‘ভাল কথা বলেছ তো,’ বিড়বিড় করল তরু। ‘এক সেকেন্ড,’ বাধা দিল তৃণা। ‘তোমরা বলতে চাইছ, তিশার ভয়টাই সবুজ আলো হয়ে দেখা দিয়েছে? তা যদি ভেবে থাকো, তোমাদের মাথা পরীা করানো দরকার।’ ‘হয়তো ওর ভয় সবুজ আলো সৃষ্টি করেনি,’ তরু বলল। ‘বরং বলা যেতে পারে, ওর ভয়ই ওই সবুজ আলোটাকে টেনে এনেছিল, ওর আলমারির ভেতর।’ ‘কী বলছ, কিছুই বুঝতে পারছি না,’ সাব্বির বলল। ‘সহজ করে বলো।’ ‘সহজ করেই তো বললাম,’ তরু বলল। ‘আমরা ধরে নিয়েছি, এই আলমারিটাতে অদ্ভুত কিছু আছে। যুক্তিসঙ্গত অনুমানই বলা যেতে পারে। কারণ, আজব আলোটা এই আলমারি থেকেই বেরিয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে, রাত দুপুরে, অন্য কোথাও না এসে ঠিক এই জায়গাটাতেই, এই আলো আসার জন্য হয়তো তিশাই দায়ী। আমার এখন মনে পড়ছে, তিশা এই আলমারিটার সম্পর্কে প্রায়ই বলত, এটার দিকে তাকালেই নাকি ওর ভয় লাগত, বিশেষ করে যখন এটার পাল্লা সামান্য ফাঁক হয়ে থাকত।’ ‘সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়,’ তৃণা বলল। ‘অনেক ছেলেমেয়েই এ ধরনের আলমারি, সিন্দুক, এসবকে ভয় পায়। তারা ভাবে, এগুলোতে ভুতুড়ে কিছু থাকে, যখন-তখন বেরিয়ে এসে ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে গায়েব করে দেবে। ছোটরা তো পাবেই, অনেক বড়রাই ভয় পায়।’ ‘ঠিকই বলেছ,’ তরু বলল। ‘এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ধারণাটা হয়েছে আমার। অন্ধকারে ওর এই আলমারিটাকে ভয় পেত তিশা। দিনের পর দিন ওই ভয় জমা হতে হতে এত বেশি হয়ে গেছে, সেটাকে ভিত্তি করে একেবারে ঘরের ভেতর এসে ওকে আক্রমণের সাহস পেয়েছে জিনিসটা।’ মাথা নাড়ল তৃণা। ‘একেবারেই আজব ভাবনা, উদ্ভট তত্ত্ব, তা-ও কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়া। তিশার উধাও হওয়ার অন্য কোন কারণ থাকতে পারে না? এই যেমন, আমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাত দুপুরে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে চলে গেছে?’ ‘আমাকে ফোন করার সময় ভয় পাচ্ছিল ও,’ তরু বলল। ‘ওর গলা শুনেই বুঝতে পেরেছি।’ ‘সেটা অভিনয় হতে পারে,’ তৃণা বলল। ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, আগে তরুর কথাগুলো ভালমত বুঝে নিই,’ সাব্বির বলল। ‘তরু, তুমি বলতে চাইছ, আলমারির অন্ধকারে দুষ্ট কোন কিছু আছে, তিশার এ ভয়টা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, যা স্পেস-টাইম বা চতুর্থ মাত্রার স্তরকে ছিন্ন করে ভিন্ন ডিমেনশনে নিয়ে চলে গেছে ওকে, দুষ্ট কোন কিছুর জগতে, কিংবা যেখানে সত্যি সত্যি দুষ্ট কোন কিছু আছে?’ ‘ঠিক তা-ই,’ মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘এর মানেটা কী? তোমরা কি সব আইনস্টাইন হয়ে যাচ্ছ নাকি?’ বিড়বিড় করল তৃণা। তৃণার কথার জবাব না দিয়ে আপনমনে বলল তরু, ‘তিশাই আজব কিছুর স্রষ্টা, আলমারিটা নয়Ñএই আইডিয়া থেকে আমাদের এগোনোর একটা সূত্র পাওয়া গেল।’ ‘তুমি বলতে চাও, দলের মধ্যে সবচেয়ে ভিতু ছিল ও?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘না,’ তরু জবাব দিল। ‘একটা কথা তো মানতেই হবে, কোন না কোন জিনিসকে ভয় পাই আমরা। তিশা ভয় পেত এই আলমারিকে, আর, তাই, এর মধ্যেই সময়ের স্তরটা ছিন্ন হয়েছে।’ এক মুহূর্ত থামল ও। ‘সালমার বিশেষ মতা আছে, শক্তিশালী জ্ঞানেন্দ্রিয় বলতে পারো একে, যা আমাদের নেই। আর এটার সাহায্যেই ভয়টা টের পেয়েছে ও, আমার তত্ত্বের সহায়ক হয়েছে।’ সালমার দিকে তাকাল তৃণা। ‘ওর এই উদ্ভট তত্ত্বের ব্যাপারে তুমি একমত?’ তরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়ে মাথা ঝাঁকাল সালমা। ‘কখনও ভুল করতে দেখিনি ওকে।’ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল তৃণা। ‘নাহ্, মাত্র কয়েক দিনেই তুমিও ওর ভক্ত হয়ে গেলে।’ তরুকে বলল সাব্বির, ‘তুমি যা বললে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তো সময়ের স্তরের এই ছেঁড়া বা ভাঙা যা-ই বলো, সেটা মেরামত করতেও তো আবার তিশাকেই দরকারÑতিশা আর ওর ভয়।’ গম্ভীর হয়ে আছে তরু। ‘এমনও হতে পারে, সময়ের স্তরের এই ভাঙা জায়গাটা, যেটা দিয়ে ঢুকে গেছে তিশা, সেটা ইতোমধ্যেই জোড়া লেগে গেছে, আর খুলতেই পারলাম না আমরা।’ চুপ করে শুনছিল এতণ তৈমুর। এখন বলল, ‘আমি এ ব্যাপারে একমত হতে পারলাম না। ভয়ই যদি দুষ্ট জিনিসটাকে আমাদের সময়ে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে ওই ভয়টাকেই চালু করব আমরা আবার, ভয় উৎপাদন করব।’ ‘কিন্তু অভিনয় করে তো আর ভয় সৃষ্টি করতে পারব না। ভয় পাওয়ার ভান করে লাভ হবে না, এর জন্য সত্যিকারের ভয় পাওয়া দরকার। যে ভয়, সালমার ভাষায়, এই ঘরের মধ্যে থিকথিক করছে।’ একটু থেমে যোগ করল তরু, ‘এ রকম ভয় পেত বলেই সবুজ আলোটা দেখতে পেয়েছে ও, আর শুধু তার চোখেই পড়েছে। এই ঘরের অন্ধকারে প্রচণ্ড ভয় পেত ও।’ ‘আমি অবশ্য একটা ভিতু ছেলেকে চিনি,’ তৃণা বলল। ‘যে এতই ভিতু, সকালবেলা স্কুলে হেঁটে যেতেও ভয় পায়।’ ‘কাকে?’ একসঙ্গে প্রশ্ন করল সবাই। ‘দিপু,’ তৃণা বলল। ‘ভুলে গেছ ওর কথা? আমাদের পাড়ার সেই নতুন ছেলেটাÑজয়নাল সারের ভেতরে ঢুকে পড়া পিশাচটার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের সাহায্য করেছিল। দিপু ওর নিজের ছায়াকেও ভয় পায়। এই সবুজ আভাটা যদি এ শহরের ভিতু ছেলেমেয়েদের খোঁজেই এসে থাকে, তাহলে আমি শিওর, তার কাছে দিপুর ঠিকানাও আছে।’ উত্তেজিত মনে হলো তৈমুরকে। ‘হ্যাঁ, দিপুর কথা মনে আছে আমার। আসলেই ও একটা ভিতু, এত ভিতু দেখা যায় না। ওকে দিয়ে সময়ের স্তর আবার খোলাতে পারব আমরা।’ ‘এমনও তো হতে পারে, ওর ভয়কে ব্যবহার করে সময়ের স্তরকে খোলাতে পারলাম আমরা,’ তরু বলল, ‘কিন্তু সেটা যে একই ফোকর হবেÑযেটা দিয়ে তিশা চলে গেছে, শিওর হব কী করে? একেবারে ভিন্ন কোনও ফোকর দিয়ে অন্য কোনও ডিমেনশনে চলে যেতে পারি।’ ‘কিন্তু ঝুঁকিটা নিতেই হবে,’ তৈমুর বলল। ‘এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সারারাত শুধু যুক্তিতর্কের কচকচানিতে লাভ হবে না। হঠাৎ করেই তিশা এসে উদয় হবে আবার, সেটা মনে করার কোন কারণ নেই।’ ‘ঠিকই বলেছ,’ তরু বলল, ‘অ্যাকশনে যেতে হবে আমাদের।’ ‘কিন্তু দিপু যদি এতই ভিতু হয়ে থাকে,’ সাব্বির বলল, ‘আমাদের সহযোগিতা করতে আসবে কেন? সবুজ আলোর কথা শুনলেই তো ভয়ে কুঁকড়ে যাবে।’ ‘ও যদি আমাদের সহযোগিতা করতে না চায়, তাহলে তো আরও ভাল,’ তৃণা বলল। ‘তবে আমি জানি, ইচ্ছে না থাকলেও সহযোগিতা করতে বাধ্য হবে।’ ‘বুঝলাম না,’ সাব্বির বলল। ‘তোমার আর বুঝে কাজ নেই,’ দুই হাতের তালু ডলল তৃণা। ‘ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। এমন ভয় দেখাব, ভয়ের চোটে ওর আলমারির দরজায় আট-দশখান তালা লাগিয়ে দেবে।’
পাঁচ. জেগে উঠে তিশা দেখল একটা আবছা অন্ধকার বনের ভেতরে পড়ে রয়েছে ও। ঘাসের ওপর চিত হয়ে। ঘাসে ছাওয়া ছোট একটা তৃণভূমিতে। ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা লম্বা লম্বা গাছে ঘেরা জায়গাটা। উঠে বসে ভালমত দেখল ও, মৃদু সবুজ আভা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। মেঘও নেই, তারাও নেই, চাঁদও নেই। দূরে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মস্ত ছায়ার মত কোনকিছু, নিশ্চয় পর্বতমালা। পানি বয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তবে সেটা কাছাকাছি নয়। এত অন্ধকার নয়, যে চোখে দেখে চলাফেরা করা যাবে না, আবার সবকিছুই কেমন ঝাপসা, যদিও খুব মৃদু। নিজের চোখের সমস্যা কি না ভাবল। বারবার চোখ বুজে, খুলে, তাকাল। ডলেও দেখল কয়েকবার। আলোর কোন পরিবর্তন হলো না। তারমানে ঠিকই দেখছে। কোন মানুষ চোখে পড়ল না। একেবারেই জনমানবহীন একটা জায়গা। যে জিনিসটা ওকে ধরে নিয়ে এসেছে, ওটাকে কোথাও দেখা গেল না। মনে পড়তেই গায়ে কাঁটা দিল ওর। অস্পষ্টভাবে মনে পড়ল, পেটমোটা একটা প্রাণী, বড় বড় সবুজ চোখ, লালা গড়ানো মুখে অসংখ্য ধারাল দাঁত। ওর হাত খামচে ধরেছিল ওটা। একটা চিৎকার দিয়েছিল শুধু তিশা, তারপর অন্ধকার, আর কিছু মনে নেই। ওকে যে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, দলের বাকি সবাই সেটা বুঝতে পেরেছে কি না কে জানে। হয়তো এখন ওকে খুঁজতে শুরু করেছে তরুরা। কিন্তু কোথায় খুঁজবে ওরা? আলমারির পেছনে? এ জায়গাটা কোথায়, ও নিজেই তো বুঝতে পারছে না। এটা কি কল্পলোক, না কোন জাদুর দেশ? যা-ই হোক, ওকে এখানে ধরে এনেছে কেন? এখনও যে কোন তি করেনি, সেটাই ভাগ্য। উঠে দাঁড়াল তিশা। পাজামার নিচে লেগে থাকা ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে চারপাশে তাকাল। পেছনে একটা শব্দ হলো। বনের ভেতরে। পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল ও। হালকা-পাতলা একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে, রূপকথার এলফদের মত দেখতে। একটা তরু, তিশার বয়সীই হবে। অনেকটা মানুষের মতই চেহারা। কানের মাথা সুচালো। গায়ের রঙ হালকা সবুজ, জ্বলজ্বলে। পরনে আঁটো পাজামা, গায়ে ধূসর রঙের আলখেল্লার মত পোশাকের ঝুল হাঁটুর কাছে নেমেছে। কোমরের চামড়ার বেল্ট থেকে ঝুলছে একটা লম্বা রুপালি তলোয়ার। ডান হাতের তালু ওটার বাঁটের ওপর রেখে বড় বড় সবুজ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এক কাঁধে ঝোলানো একটা বড় ধনুক, অন্য কাঁধে তূণ ভর্তি তীর। তিশার চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা, পাতলা গড়ন হলেও পেশিবহুল দেহ। ভাবভঙ্গি রু, ওকে দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হলো না। ‘জেগেছ,’ নরম পরিষ্কার গলায় বলল প্রাণীটা। ‘আমি তোমাকে দেখছিলাম।’ ‘তুমি বাংলা জানো,’ অবাক হয়ে বলল তিশা। ‘তুমি যে ভাষায় কথা বলবে, আমি সেটা বলতে পারব।’ ‘মানে?’ তলোয়ারের বাঁট থেকে হাত সরিয়ে এনে মাথার একপাশ ছুঁলো ওটা। ‘তোমার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলতে হবে, সেটা আমি আপনা আপনি জেনে যাই।’ ‘ক্ষুার মানে, তুমি আমার মন পড়তে পারো?’ ‘না।’ ‘তাহলে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে থেকেই বাংলা জানতে?’ ‘না।’ ‘তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না,’ তিশা বলল। ‘তুমি মানুষ। মানুষরা বুঝতে অনেক সময় নেয়।’ অপমানিত বোধ করল তিশা। ‘তুমি কে?’ ‘আমি জুগর। তুমি এখন ক্রিটাইন রাজ্যে রয়েছ।’ ‘এখানে আমি এলাম কিভাবে?’ তিশার কাঁধের ওপর দিয়ে অন্যপাশে তাকাল জুগর। মনে হলো ভ্রƒকুটি করল। ‘সম্ভবত একটা ঢেঁকুর তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে,’ ছেলেটা বলল। ‘ধরে আনতে দেখিনি, তবে আমি যখন দেখেছি, তুমি তখন ওর বাহুতে এলানো ছিলে।’ আবার তলোয়ারের বাঁটে হাত ছোঁয়াল জুগর। ছোট্ট তৃণভূমির অন্যপাশ দেখিয়ে বলল, ‘আমি ওটাকে মেরে ফেলেছি।’ ‘মারলে কেন?’ ‘আমার সামনে পড়েছিল। তোমাকে মেরে ফেলত।’ মুখ বাঁকাল তিশা। ‘সত্যি?’ মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা। ‘তোমাকে জ্যান্ত সিদ্ধ করে তোমার মগজ খেত। মানুষের মগজ ঢেঁকুরদের খুব প্রিয় খাবার।’ পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল তিশার। ‘আমাকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এই ঢেঁকুররা কোথা থেকে এসেছে?’ ‘আসেনি, এখানেই ছিল, ক্রিটাইনের এদিকটাতেই থাকে ওরা।’ হালকা বিরক্তি ছেলেটার কণ্ঠে। ‘বুদ্ধিমান লোকেরা পারতপে এদিকে আসে না।’ ‘আমার তো আর আসার ইচ্ছে ছিল না। ধরে এনেছে। আমি বাংলাদেশের মেয়ে। ওটা কোথায় জানো তুমি?’ ‘তুমি কি পৃথিবী থেকে এসেছ?’ ‘হ্যাঁ।’ মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা। ‘পৃথিবীর নাম আমি জানি।’ ‘তাই? খুব ভাল। আমি ওখানে কিভাবে ফিরব, বলতে পারো?’ ‘ফিরতে তো আর পারবে না। পৃথিবী রয়েছে পর্দার অন্যপাশে।’ ‘কিসের পর্দা?’ আজব আকাশের দিকে হাত তুলল ছেলেটা। ‘স্বপ্নলোকের পর্দা।’ উদ্বিগ্ন হতে শুরু করল তিশা। ‘কিন্তু আমাকে যে ফিরে যেতেই হবে। কালকের হোমওয়ার্ক বাকি, স্কুলে যেতে হবে। আমার পরিবার আছে। মা আছে। ছোট একটা ভাই আছে। ওটাই আমার আসল জায়গা। এখানে নয়।’ ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটা। পা বাড়াল। ‘সেটা আমার ভাবনা নয়। ও নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’ ‘দাঁড়াও! কোথায় যাচ্ছ?’ থামল ছেলেটা। ‘যুহারে ফিরতে হবে।’ ‘যুহার কী?’ ‘ক্রিটাইনের রাজধানী। ওখানেই থাকেন ব্রোমা, ক্রিটাইনের মহামান্য রাজা।’ ‘কে এই ব্রোমা?’ ‘এইমাত্র তো বললাম। তুমি কে?’ ‘আমার নামি তিশা টেলর।’ হাত বাড়াল ও। ছেলেটা ওকে এই ভয়াল বনে ঢেঁকুরদের এলাকায় ফেলে চলে যাক, চায় না ও। মানুষের মগজখেকো প্রাণী, যেমন বিদঘুটে চেহারা, তেমনি নাম। ভাবতেই শিউরে উঠল তিশা। কিন্তু জুগর নির্বিকার ভঙ্গিতে ওর হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল, ধরল না। তিশা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে তোমার সঙ্গে নেবে?’ ভেবে জবাব দিল ছেলেটা, ‘তুমি আমার গতি কমিয়ে দেবে।’ ‘না, আমি খুব জোরে হাঁটতে পারি,’ তিশা বলল। ‘আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না।’ ‘কেন?’ ‘তুমিই তো বললে, এটা ঢেঁকুরদের এলাকা। আবার কোন একটা ঢেঁকুর আমার ওপর হামলা চালাতে পারে।’ ‘ও নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই,’ জবাব দিল জুগর। ‘কিন্তু মাথাব্যথা হওয়া উচিত। দেখো, একবার তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। আরেকবার সাহায্য করলে অসুবিধে কী?’ ‘তোমাকে বাঁচাইনি, আসলে জানোয়ারটা আমার সামনে পড়ে গিয়েছিল, একেবারে মুখোমুখি। নইলে এতে নাক গলাতাম না আমি।’ ‘আমি জেগে ওঠা পর্যন্ত তুমি অপো করেছ।’ ‘না, তোমার জন্য নয়, বসে বিশ্রাম নিয়েছি।’ ‘তার মানে তুমি জানোয়ারটাকে আমার মগজ খেতে দিতে?’ ‘হ্যাঁ।’ বিরক্ত হলো তিশা। ‘তুমি যে মোটেও বন্ধুর মত আচরণ করছ না, জানো সেটা?’ ‘এ নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’ ‘তাহলে কী নিয়ে তোমার মাথাব্যথা আছে?’ ‘যুহারে ফেরা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’ ‘আমি তোমার সঙ্গে যুহারে যেতে চাই। এই ব্রোমা চরিত্রটাকে দেখতে চাই।’ ‘ব্রোমার সম্পর্কে ওরকম তাচ্ছিল্য করে কথা বোলো না। ব্রোমা কোন চরিত্র নন, ব্রোমা সারা ক্রিটাইনের রাজা।’ ‘জানি, আগে একবার বলেছ। ওই রাজার সঙ্গে আমি দেখা করে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর উপায় জানেন কি না।’ একটু থেমে বলল, ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ব্রোমা খুব জ্ঞানী আর মতাশালী।’ দ্বিধা করল জুগর। ‘হ্যাঁ, ব্রোমা ভীষণ জ্ঞানী আর মতাশালী।’ ‘তবে?’ জুগরের কথার ঢঙে তিশার মনে হলো, রাজা খুব একটা মিশুক নয়। ‘তবে শব্দটা তো বলিনি আমি,’ জুগর বলল। ‘কিন্তু তোমার কি মনে হয় রাজা আমাকে সাহায্য করতে পারবে?’ ‘জানি না। প্রয়োজনও মনে করি না।’ আবার পা বাড়াল জুগর। ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। ‘তোমার ইচ্ছে হলে, আসতে পারো। তবে তোমার জন্য আমি গতি কমাব না। তোমাকে আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নিজের মতায় বাঁচতে হবে। কোন ঢেঁকুর যদি হামলা চালায়, প্রথমে আমি নিজেকে বাঁচাব, তারপর তোমাকে দেখব।’ জুগরকে ধরার জন্য দৌড় দিল তিশা। খুব জোরে হাঁটছে ছেলেটা। ‘যাক, তা-ও তো আমাকে দেখার কথা বললে। তার মানে খুব সামান্য হলেও আমাকে ভাল লেগেছে তোমার।’ ‘মানুষকে ভাল লাগার কোন কারণ নেই।’ ‘কেন?’ ‘মানুষ দেখতে অদ্ভুত। কাজকর্মও কেমন আজব।’ ‘আমাদের দেশে যদি তুমি যাও, মানুষরাও তোমাকে এ কথাই বলবে। ওরকম বিড়ালের মত চোখা কান। কখনও ভেবেছ এটা?’ ‘না। মানুষ আমাকে নিয়ে কী ভাবল না ভাবল, তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।’ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল তিশা। ‘যুহার এখান থেকে কতদূর?’ ‘তোমাদের সময়ের হিসেবে পুরো একটা দিন লাগবে, খুব জোরে জোরে হাঁটলে।’ ‘হাঁটার সময় মাঝখানে কি থামব আমরা, জিরানোর জন্য?’ ‘তোমার ইচ্ছে হলে থেমে বিশ্রাম নিতে পারো। আমি থামব না।’ ‘তুমি সত্যিই আমাকে ঢেঁকুরদের খাওয়ার জন্য ফেলে রেখে যাবে?’ ‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ল তিশা। ‘তোমার আচরণ খুব খারাপ, জানো সেটা?’ ‘একবার বলেছ ওকথা। তবে ও নিয়ে...’ ‘হ্যাঁ, জানি,’ বাধা দিল তিশা। ‘তোমার কোন মাথাব্যথা নেই।’ ছয়. দিপুদের বাড়িতে এসে ওর বেডরুমের জানালার কাছে দাঁড়াল দলটা। আস্তে করে ওর জানালায় টোকা দিল তৃণা। বেঢপ শরীর মুখের তুলনায় বড় নাক আর ছোট্ট শরীরের ছেলেটা জবাব দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি করল। ওর পরনে লাল রঙের পাজামা। মোটা ভুরুর ওপরে বসানো লাল রঙের ক্যাপটাও অদ্ভুত দেখাচ্ছে। দলটাকে দেখে অবাক হলো ও। ‘এখানে কী তোমাদের?’ জিজ্ঞেস করল। ‘তোমাকে সাবধান করতে এসেছি,’ তৃণা বলল। ‘পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। তিশার কথা মনে আছে?’ ‘কোঁকড়া কালো চুলওয়ালা সুন্দরী মেয়েটা?’ ‘যতটা সুন্দরী বলছ তত নয়। যা-ই হোক, একটা ভয়ঙ্কর দানব ওকে তুলে নিয়ে গেছে।’ মুখে হাত চেপে ধরল দিপু। ‘কি সাংঘাতিক! পুলিশকে জানিয়েছ?’ ‘এ শহরে পুলিশকে জানানো যায় না,’ তরু বলল। ‘কেন যায় না?’ ‘ওরা এত ভিতুর ভিতু, থানার বাইরে বেরোতেই ভয় পায়,’ তৃণা বলল। ‘শোনো, এতণে তিশার যা ঘটার ঘটে গেছে। নিশ্চয় ওকে খেয়ে ফেলেছে দানবটা। ওকে বাঁচাতে তোমার কাছে আসিনি আমরা, এসেছি তোমাকে বাঁচাতে। ওই ভয়ানক দানবটা কোথায় বাস করে শুনবে? লোকের বাড়ির আলমারিতে।’ কেঁপে উঠল দিপু। ‘তিশার আলমারিতে ছিল?’ সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল তৃণা, যেন কি এক জরুরি গোপন কথা বলছে, ‘শুধু ওর আলমারি নয়, যে কোন ধরনের আলমারিতে বাস করে ওটা। তবে সবাইকে ধরে না। যে ভয় পায়, তাকে ধরে। ভয় ওকে ওর ডিমেনশনের গোপন দরজা খুলতে সাহায্য করে। তুমি যদি ভয় পাও, তোমাকেও ধরবে। একবার ধরলে আর কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। বাঁচার জন্য যেটা এখন করতে হবে তোমাকে, মনে সাহস রাখতে হবে, ভয় পাওয়া চলবে না।’ থামল তৃণা। তারপর বলল, ‘এটা জানাতেই তোমার কাছে এলাম। ভাবলাম, তোমাকে সাবধান করে দেয়া আমাদের কর্তব্য। তবে এখন আমাদের যেতে হয়, অন্য ছেলেমেয়েদের সাবধান করতে...’ যাওয়ার জন্য ঘোরার ভান করল তৃণা, দলের অন্যরাও তা-ই করল। ‘দাঁড়াও!’ চেঁচিয়ে উঠল দিপু। ‘আমাকে ফেলে যেয়ো না। আমার ভয় লাগছে।’ থামল তৃণা। মাথা নাড়ল। ‘তাহলে আজ রাতে তোমাকে নিতেই আসবে ওটা। তোমার জন্য কিছুই করতে পারব না আমরা। আমরা তোমাকে সাবধান করে দিয়েছি, কিন্তু কোন লাভ হলো না। তোমার জন্য সত্যিই দুঃখ লাগছে আমার, দিপু।’ ‘তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, ভাবলে পরে আসলেই লাগবে,’ তৃণার সঙ্গে যোগ করল তরু। আবার যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল সবাই। ‘দাঁড়াও!’ অনুনয় করল দিপু। ‘তোমরা থাকো। আমাকে বাঁচাও।’ আবার থামল তৃণা। ‘আমরা কিছুই করতে পারব না, নিজেকে তোমার নিজেরই বাঁচাতে হবে। বললামই তো, ওটা তোমাকে তখনই শুধু ধরবে, যখন তুমি ভয় পাবে।’ ‘দানবটার কথা আমাকে না জানালেই ভাল করতে,’ দিপু বলল। ‘তোমরা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার আগে তো ভয় পাচ্ছিলাম না।’ রেগে যাওয়ার ভান করল তৃণা। ‘হায়রে কপাল, যার জন্য চুরি করি সে-ই বলে চোর! আরে মিয়া, আমরা তো তোমার উপকার করতে এসেছিলাম। অথচ তার জন্য একটা ধন্যবাদ তো দিলেই না, উল্টে দোষ দিচ্ছ। রাত দুপুরে কাজটাজ, স্কুলের হোমওঅর্ক সব বাদ দিয়ে, তোমাকে সাবধান করতে ছুটে এলাম। নাহ্, যেচে পড়ে কারও উপকার করতে যাওয়া উচিত না। তুমি একটা অকৃতজ্ঞ।’ সঙ্গে সঙ্গে মাপ চাওয়ার ভঙ্গি করল দিপু। ‘সরি, আমি সত্যিই দুঃখিত। তোমরা এসেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি। থ্যাংকস। তোমরা আমার সঙ্গে থাকো।’ ‘কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকলে শহরের অন্য ছেলেমেয়েদের সাবধান করতে পারব না,’ তরু বলল। ‘এখানে বসে যখন তোমাকে পাহারা দেব আমরা, ওরা সব মরবে। তোমার কারণে আরও অনেকে মারা যাক, এটা নিশ্চয় তুমি চাও না।’ তোতলাতে লাগল দিপু, ‘না...কি-কি-কিন্তু...কিন্তু...’ বাধা দিয়ে তৃণা বলল, ‘তা ছাড়া তিশার আম্মার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। তাঁর মেয়ে যে হারিয়ে গেছে, জানাতে হবে। বিষয়টাকে কোনমতেই হালকাভাবে নিতে পারি না আমরা।’ নিঃশ্বাস ভারি হয়ে গেল দিপুর। ‘সত্যিই দানবটা ওকে খুন করেছে?’ ‘নাও, বোঝো,’ হতাশ ভঙ্গিতে হাত ওল্টাল তৃণা। ‘তাহলে এতণ ধরে কী বকবক করলাম? জ্যান্ত ধরে খেয়েছে। প্রথমে মগজ খুলে খেয়েছে।’ ‘তারপর হৃৎপিণ্ডটা বের করে কচকচিয়ে চিবিয়ে কপ করে গিলে ফেলেছে,’ মুখ কালো করে বলল তরু। ‘আর তারপর...’ বলতে গেল তৃণা। গুঙিয়ে উঠে ওকে থামিয়ে দিল দিপু। ‘না না, আর বোলো না। ভয়ঙ্কর ব্যাপার।’ ‘পৃথিবীটা বড় কঠিন জায়গা, দিপু,’ সহানুভূতির সুরে বলল তৃণা। ‘হুঁ,’ মাথা ঝাঁকাল দিপু। ‘কিন্তু তোমাদের মধ্যে তো কোনও বিকার নেই। এত ভয়ানক একটা ঘটনা ঘটল, তোমাদের মুখে কোন রকম দুঃখের ছাপ নেই। হাজার হোক, ও তোমাদের বন্ধু ছিল।’ ‘এখানে থেকে আমরা একটা জিনিস শিখেছি, এ শহরে টিকে থাকতে হলে কারও সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো উচিত না,’ বুঝিয়ে বলল তরু। ‘এভাবে থাকাই ভাল। এই যেমন, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি তোমার ভয়ঙ্কর মৃত্যু ঘটে, আর সেটা আমাদের চোখের সামনে, হয়তে খারাপ লাগবে, তবে খুব খারাপ লাগবে না আমাদের।’ ‘কিন্তু আমার খারাপ লাগবে,’ দিপু বলল। ‘তুমি তো তখন মরেই যাবে, তোমার আর খারাপ লাগবে কিভাবে? কোন অনুভূতিই থাকবে না তোমার।’ বলে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল তরু। বাকি সবাই ওর পিছু নিল। মুখ ফিরিয়ে তরু বলল, ‘আমাদের যা করার করেছি, এখন তোমারটা তুমি বোঝো। চলি, গুড-নাইট।’ ‘কি করে গুড-নাইট হবে?’ ককিয়ে উঠল দিপু। কিন্তু এবার আর থামল না ওরা। হাঁটতে হাঁটতে দিপুর দৃষ্টির বাইরে চলে এল। বাড়ির পাশ ঘুরে। অন্ধকারে থেমে দাঁড়াল কথা বলার জন্য। ‘আজ রাতে আর দুই চোখের পাতা এক করতে পারবে না ও,’ তৃণা বলল। ‘ভালভাবেই সামলেছ ওকে,’ তরু বলল। ‘থ্যাংক ইউ,’ তৃণা বলল। ‘ভয় দেখানো আর বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তুমিও কম যাও না। আমার সঙ্গে যেভাবে তাল মেলালে।’ ‘এখন ওর অলে ওর ওপর আমাদের নজর রাখা দরকার,’ সাব্বির বলল। ‘কোথায় লুকানো যায়? ওদের বাড়ির পেছনের গাছে চড়ব?’ ‘না, ওটা অনেক দূরে,’ মাথা নাড়ল তরু। ‘আলমারির দানবটা বেরিয়ে এসে যদি ওকে নিয়ে যেতে চায়, বাঁচানোর সময় পাব না। ঠিক ওর জানালার বাইরেই থাকতে হবে আমাদের।’ ‘আমাদের দেখে ফেলে যদি ও?’ তৈমুরের প্রশ্ন। ‘ঝুঁকিটা নিতেই হবে আমাদের,’ তরু বলল। ‘ওটা কোন ঝুঁকি হবে বলে মনে হয় না,’ মৃদুকণ্ঠে বলল তৃণা। ‘আলমারির ভয়ে এতই কাবু হয়ে থাকবে এখন, রোদ ওঠার আগে আর বিছানা থেকে নামবে না। আমরা যে ওর জানালার বাইরে আছি, জানতেই পারবে না।’ ‘দানবটা যদি আসে তো কী করব?’ সালমা জিজ্ঞেস করল। ভ্রƒকুটি করল তৈমুর। ‘হ্যাঁ, আসল প্রশ্নটা করেছ। আমরা ধরেই নিচ্ছি, দানবটাকে সামলাতে পারব আমরা। কিন্তু যদি আমাদের পাঁচজনকে কাবু করে ফেলার মত শক্তিশালী হয় ওটা?’ ‘তাহলে আর কী, বিপদে পড়ব,’ সাব্বির বলল। ‘ঠেকানোর কোন না কোন উপায় নিশ্চয়ই আছে,’ তরু বলল। ‘সেটা কী?’ তৃণার প্রশ্ন। ‘এখনও জানি না,’ জবাব দিল তরু। ‘বাহ্, ভাল,’ মুখ বাঁকাল তৃণা। ‘তবে যত যা-ই ঘটুক,’ তৈমুর বলল, ‘দিপুকে নিতে দেয়া যাবে না। ওকে বাঁচাতেই হবে।’ মাথা নাড়ল তরু, ‘ওকে বাঁচানোর চেয়ে দানবটার জগতে আমাদের ঢুকে পড়া অনেক বেশি জরুরি, যদি তিশাকে বাঁচাতে চাই। দিপুর কথা পরেও ভাবা যাবে।’ ‘আর আমাদের নিজেদের কথা?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। তবে ওর প্রশ্নের জবাব দিল না কেউ, কিংবা দিতে পারল না। নিঃশব্দে আবার বাড়িটার পেছনে চলে এল ওরা, দিপুর জানালার নিচে। মাথা উঁচু করে উঁকি দিল ঘরের ভেতরে। আলো জ্বেলে রেখেছে দিপু। আলমারির ভেতরের খুঁটিয়ে দেখছে কোথাও কোন দুর্বলতা আছে কি না, যেখান দিয়ে দানবটা ঢুকতে পারে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে দেখার পর, আলো নিভিয়ে, বিছানায় শুতে গেল। তিশার মত করেই একটা চেয়ার ঠেসে দিল আলমারির গায়ে, হাতলটার নিচে, যাতে ভেতর থেকে ওটা ঘোরানো না যায়। কিন্তু বিছানায় শুয়ে এত বেশি ছটফট আর গড়াগড়ি করতে লাগল দিপু, মনে হলো না রোদ ওঠার আগে আর ঘুমাতে পারবে। ‘ভয় দিয়ে সময়ের স্তর তো বটেই, বাড়ির দেয়ালও যদি ভেঙে ফোকর বানিয়ে ফেলে ও, অবাক হব না,’ ফিসফিস করে বলল তৃণা। ‘ওর জন্য খারাপই লাগছে আমার,’ মৃদুকণ্ঠে বলল সালমা। ‘আমারও,’ তরু বলল। ‘সহানুভূতি এ শহরের জন্য একটা মারাত্মক আবেগ,’ তৃণা বলল। ‘আস্তে বলো,’ ফিসফিস করে বলল তরু। ‘তোমারও এই আবেগ কম না, তৃণা। তিশার জন্য যদি তোমার খারাপ না-ই লাগবে, আমাদের সঙ্গে তুমি কেন এলে?’ ‘তা ঠিক,’ তৃণা বলল। ‘কিন্তু ওকে যদি আমরা বাঁচাতে পারি, দয়া করে এ কথাটা বোলো না ওকে। ও আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে। চমৎকার একটা রেষারেষির সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের।’ চুপ হয়ে গেল ওরা। এবার অপোর পালা। আলমারি আর দিপুর দিকে নজর রাখতে লাগল। আরও এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যে সন্দেহ শুরু করেছে ওরা, সবুজ আলোটা আদৌ দেখা যাবে কি না। দিপু এখনও ঘুমায়নি। বিছানায় নড়াচড়া করেই চলেছে। মচমচ শব্দ করছে খাটের স্প্রিং। প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে ও, ওরা যতটা ভেবেছিল, তারচেয়ে বেশি। ‘ওই যে!’ ফিসফিস করে বলল তৃণা। ‘চুপ করে থাকো, একদম নড়াচড়া কোরো না,’ তরু বলল। ‘ওই সবুজ আলোটা দেখা যাওয়ার মানেই ভিন্নজগতে যাওয়ার ফোকর সৃষ্টি হয়েছে, তা না-ও হতে পারে। প্রথম রাতে দানবটাকে দেখতে পায়নি তিশা, ভুলে যেয়ো না।’ ‘আলোটা নিশ্চয়ই আলেকের চোখেও পড়েছে,’ তৈমুর বলল। ‘দেখো, বিছানায় উঠে বসেছে ও। খাটের স্প্রিং কিভাবে শব্দ করছে শুনছ? ভয়ে কাঁপছে ও।’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলল সালমা। ‘ওকে সাহায্য করতে পারলে ভাল হতো।’ ‘ওকে সাহায্য না করার মানে তিশাকে করছি,’ সাব্বির বলল। তাকিয়ে আছে ওরা। আস্তে করে বিছানা থেকে নামতে দেখল দিপুকে। সুইচ টিপে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বলছে না, মনে হচ্ছে যেন তার দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহই বইছে না। অন্ধকার হয়ে রইল ঘরটা। সবুজ আলোটা বাড়ছে। ঘরের মাঝখানে মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল দিপুকে। এত বেশি ভয় পেয়েছে, দরজার দিকে দৌড়ে যেতেও সাহস করছে না। ও বুঝে গেছে, সবুজ দানবটা ওর মগজ খুবলে খেতে এসেছে। ভিতু কুকুরছানার মত কোঁ-কোঁ কাঁদতে শুরু করল ও। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে সাবধানে জানালার পাল্লা খুলতে আরম্ভ করল তরু। ‘চোখের পলকে ঢুকে পড়তে হবে আমাদের,’ ফিসফিস করে বলল ও। ‘কোথায়?’ জানতে চাইল তৃণা। ‘দানবটা যেখান থেকে এসেছে,’ জবাব দিল তরু। ‘নরকে!’ বিড়বিড় করল সাব্বির। আলমারির ভেতর খটখট শব্দ হতে লাগল। পাল্লায় ঠেস দেয়া চেয়ারটা কাঁপছে। ‘আমি ভেবেছিলাম, দানবটাকে আক্রমণ করব আমরা,’ তৃণা বলল। ‘ওটার দেশে যেতে হবে কল্পনাও করিনি।’ ‘চুপ!’ সতর্ক করল তরু। ‘রেডি থাকো।’ আলমারির ভেতর দড়াম দড়াম শব্দ হচ্ছে। পাল্লায় ধাক্কা মারছে কোন কিছু। অস্ফুট একটা চিৎকার বেরোল দিপুর মুখ থেকে, মাঝপথে থেমে গেল। কেঁপে উঠে কাত হয়ে পড়ে গেল চেয়ারটা। ঝটকা দিয়ে খুলে গেল আলমারির দরজা। গা গোলানো সবুজ আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের ভিতর। দিপুকে সবুজ দেখাচ্ছে। আবার চিৎকার করার চেষ্টা করল ও। স্বর বেরোল না। আলমারি থেকে বেরিয়ে মস্ত, ভয়ঙ্কর দানবটা ছুটে গেল ওর দিকে। ‘চলো!’ চেঁচিয়ে উঠল তরু। পরের কয়েকটা সেকেন্ড যেন নৈরাজ্য চলল। প্রথম সমস্যাটা হলো, জানালার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকা। সবাই একসঙ্গে যেতে চাইল, তৃণা ছাড়া। ফলে এ ওর গায়ের ওপর পড়ল, একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার অবস্থা হলো। তবে জানালাটা বড় হওয়াতে অসুবিধে আরও বেশি হলো, একসঙ্গে চৌকাঠে চড়তে পারল সবাই। দ্বিতীয় সমস্যা, দানবটা। ওটার প্রতি নজর থাকায় ওদের মনোযোগে বিঘœ সৃষ্টি হলো। দানবটার বর্ণনা দেয়া কঠিন। সবুজ রঙ। সারা গায়ে আঠাল পদার্থ মাখা। দেহটা মানুষের চেয়ে বড়। সবুজ রংটা অবিকল সবুজ আভাটার মত, আলমারিতে যেটা দেখা গেছে, ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক হাত ওটার, কম করে হলেও চারটে। শয়তানিভার চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে। মনে হচ্ছে, হেঁটে নয়, বাতাসে ভেসে এগোচ্ছে দিপুর দিকে, একটা সবুজ মেঘের স্তরের মত। পা আছে কি না ওই ভুতুড়ে আলোয় বোঝা গেল না। তবে, খুব দ্রত চলতে পারে। জানালা দিয়ে ওরা ঘরে ঢোকার আগেই দিপুর কাছে পৌঁছে গেল ওটা, দিপুকে খামচে ধরল। বেহুঁশ হয়ে গেল বেচারা। ‘থামো!’ চেঁচিয়ে উঠল সাব্বির। ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে ও, সবার আগে নেমেছে। পর মুহূর্তেই ওর পাশে এসে দাঁড়াল তরু। জানালার চৌকাঠে বসে এখনও ধাক্কাধাক্কি করছে তৈমুর আর সালমা, নামার চেষ্টায়। বাইরে দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছে তৃণা। ‘ধরো ওটাকে!’ চিৎকার করে বলল তরু। ‘কোনখানে ধরব?’ চেঁচিয়ে জবাব দিল সাব্বির। ‘ধরার মত জায়গা তো দেখছি না।’ ‘যেখানে খুশি!’ দিপুকে শক্ত করে ধরে একটানে শূন্যে তুলে নিয়ে আলমারির দিকে ঘুরে গেল দানবটা। ওটাকে ধরার জন্য লাফ দিয়েছিল তরু আর সাব্বির। দানবটা ঘুরে যাওয়ায় পড়ল এসে ওটার পিঠের ওপর। মেঘের মত দেখালেও গা-টা অনেক শক্ত। ধাক্কাটা বেশ জোরেই লাগল। পলকের জন্য রেগে যাওয়া একটা ভয়ঙ্কর মুখ চোখে পড়ল তরুর, ধারাল দাঁত, লালা গড়াচ্ছে। ঝাড়া দিল ওটা। উড়ে চলে গেল তরু। ভাগ্যিস মেঝেতে বা শক্ত কিছুর ওপর পড়ল না, পড়ল দিপুর বিছানায়। একটা মুহূর্তের জন্য হতচেতন হয়ে রইল। ঘোরের মধ্যে যেন দেখল, অবশেষে জানালা ডিঙাল তৃণা, দৌড়ে গিয়ে লাথি মারল দানবটার পাছায়। একেবারে সময়মত কাজটা করেছে। কারণ তখন সাব্বিরকে ধরে ওর মাথাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে ওটা। ‘মর শয়তান, পচা ডোবার পিচ্ছিল শামুক কোথাকার!’ গালি দিল তৃণা। আবার একই জায়গায় লাথি মারল। তাতে গায়ে কতটা ব্যথা পেল দানবটা, বোঝা গেল না, তবে মনে নিশ্চয় খুব ব্যথা পেয়েছে। হয়তো অপমানিত বোধ করল। একে তো মেয়েমানুষের লাথি, তার ওপর বিশ্রী গালাগাল। সাব্বিরকে হাত থেকে ছেড়ে দিল। তবে দিপুকে ছাড়ল না। তৃণার সাহায্যে এগিয়ে গেল তৈমুর। ঘরে একটা বেজবল ব্যাট খুঁজে পেয়েছে। তৃণাকে তুলে নেয়ার জন্য নিচু হলো দানবটা। এই সুযোগে দানবের মাথায় ব্যাট দিয়ে বাড়ি মারল তৈমুর, যতটা জোরে পারল। মনে হলো, আঘাতটা বেশ ব্যথা দিয়েছে দানবটাকে। টলে উঠল ওটা। দিপুও ঢিল হয়ে গেল ওটার হাতে। পিছলে পড়ে গেল মেঝেতে। এখনও বেহুঁশ। বোঝাই যাচ্ছে, খুব বেশি মতাশালী নয় দানবটা। সহজেই কাবু হয়ে যাচ্ছে। দিপুকে তোলার চেষ্টা করল না। বরং পালাতে চাইল। ঘুরে দাঁড়িয়ে নখওয়ালা একটা থাবা বাড়িয়ে দিল আলমারির দিকে। সবুজ একটা ফোকরের মত হয়ে আছে আলমারির পিছনে। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে চেঁচিয়ে উঠল তরু, ‘যেতে দিয়ো না! যেতে দিয়ো না! ওটার পেছন পেছন যাও!’ বলে সে-ই প্রথমে দানবের পেছনে ছুটল। উজ্জ্বল সবুজ আভার দিকে। তৈমুর আর তৃণা গেল ওর পেছনে। মেঝেতে পড়ে ব্যথা পেয়েছে সাব্বির। উঠতে কিছুটা দেরি হলো ওর। আর সালমা দ্বিধা করতে গিয়ে দেরি করে ফেলল। তাই সে আর সাব্বির গেল সবার পরে। সবুজ ফোকরটার কাছে সময়মত পৌঁছতে পারল না। ওরা ঢোকার আগেই বন্ধ হয়ে গেল ভিন্ন জগতে যাওয়ার পথ। তরুদের সঙ্গে যেতে পারল না ওরা। মেঝেতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। গুঙিয়ে উঠল মেঝেতে পড়ে থাকা দিপু। ‘ওরা চলে গেছে,’ ফিসফিস করে নিজেকেই যেন বলল সালমা, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যিই গেছে। কারণ ঘরে ওরা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই। বিষণœ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সাব্বির। ‘কিন্তু কোথায়?’
Responses 0
Log in to leave a response.