হুমায়ূন আহমেদ
১৫
‘স্যার, ভেতরে আসব?’
‘এস। কী ব্যাপার?
মিসির আলি মেয়েটিকে ঠিক চিনতে পারলেন না। তিনি কখনো তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের চিনতে পারেন না।
‘স্যার, আমার নাম নীলু, নীলুফার।’
‘ও, আচ্ছা।’
মিসির আলি পরিচিত ভঙ্গিতে হাসলেন। কিন্তু নামটি তাঁর কাছে অপরিচিত লাগছে। এও এক সমস্যা। কারো নাম তিনি মনে রাখতে পারেন না। তাঁর ভূ কুঞ্চিত হল। নাম মনে না-করতে পারার একটিই কারণ—মানুষের প্রতি তাঁর আগ্রহ নেই। আগ্রহ থাকলে নাম মনে থাকত।
‘স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সেকেণ্ড ইয়ারের। এক দিন এসেছিলাম আমরা চার বন্ধু।’
‘ও হ্যাঁ। এসেছিলে তোমরা। মনে পড়েছে। আজ কী ব্যাপার?’
মেয়েটি ইতস্তত করতে লাগল। তার মানে কী? কমবয়েসী মেয়েদের তিনি এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেন। তরলমতি মেয়েরা মাঝে-মাঝে অনেক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করে বসে।
‘তোমার কী ব্যাপার, বল।’
‘স্যার, আমি ঐ ইএসপির টেস্টটা আবার দিতে চাই।’
‘এক বার তো দিয়েছ। আবার কেন?’
মিসির আলি বিস্মিত হলেন। এই মেয়েটির মতিগতি তিনি বুঝতে পারছেন না।’স্যার, আমার মনে হয়, এবার পরীক্ষা করলে দেখা যাবে—আমার ইএসপি আছে।’
‘এ-রকম মনে হবার কারণ কী?’
মেয়েটি উত্তর না-দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। লক্ষণ ভালো নয়। মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এখন আমি একটু ব্যস্ত আছি। অন্য এক দিন এস।’
মেয়েটি তবুও কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইল।
‘তুমি কি অন্য কিছু বলতে চাও?’
‘জ্বি-না স্যার। আমি যাই। স্লামালিকুম।’
মিসির আলি গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। এ-মেয়েটিকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। এরা সহজেই একটা ঝামেলা বাধিয়ে দিতে পারে। এ-রকম সুযোগ দেওয়া ঠিক না।
বারটায় একটা ক্লাস ছিল। মিসির আলি গিয়ে দেখলেন কোনো ছাত্র-ছাত্রী নেই। কোনো স্ট্রাইক হচ্ছে কি? এ-রকম কিছু শোনেন নি। সামনে হয়তো টার্ম পরীক্ষা আছে। টার্ম পরীক্ষা থাকলে ছাত্ররা দল বেঁধে আসা বন্ধ করে দেয়। মিসির আলি কুঁচকে খালি ক্লাসে মিনিট পাঁচেক বসে রইলেন। গত রাতে অসুস্থ শরীরে এই ক্লাসটির জন্যে পড়াশোনা করেছেন। এ-অবস্থা হবে জানলে সকাল-সকাল শুয়ে পড়তে পারতেন। ছাত্রশূন্য একটি ক্লাসে তিনি খাতাপত্র নিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন—হাস্যকর দৃশ্য। অনেকেই করিডোর দিয়ে হাঁটবার সময় তাঁকে কৌতূহলী হয়ে দেখল। পাগলটাগল ভাবছে বোধহয়। মিসির আলি উঠে পড়লেন।
আজকের দিনটিই শুরু হয়েছে খারাপভাবে। একটি কাজও ঠিকমতো হচ্ছে না। মিসির আলি ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর কপালের মাঝখানে ব্যথা শুরু হল। এই উপসর্গটি নতুন। ব্লাড প্রেশারট্রেশার হয়েছে বোধহয়। ডাক্তার দেখাতে হবে।
তিনি বাড়ি ফিরলেন তিনটার দিকে। এই অসময়েও বসার ঘরে কে যেন বসে আছে। সমস্ত দিনটিই যে খারাপ যাবে, এটা হচ্ছে তার প্রমাণ। গ্রামের বাড়ি থেকে টাকাপয়সা চাইতে কেউ এসেছে নির্ঘাত।
‘কে?’
‘জ্বি, আমি আনিস।’
‘আনিস সাহেব, আপনি এই সময়ে! অফিস নেই?’
‘ছুটি নিয়ে এলাম।’
‘ব্যাপার কী?’
‘রানুর শরীরটা বেশি খারাপ। ভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই।‘
‘ভালোই করেছেন। বসেন, চা-টা দিয়েছে?’
‘জ্বি, চা খেয়েছি। আপনার ভাই ছিলেন এতক্ষণ।’
‘বসুন, আমি কাপড় ছেড়ে আসি।’
লোকটি জড়সড় হয়ে বসে আছে। মিসির আলি লক্ষ করলেন, তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। তার মানে রাতে ঘুমাতে পারছে না। এ রকম হওয়ার কথা নয়। মিসির আলি চিন্তিত মুখে ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর ফিরে আসতে অনেক সময় লাগল।
‘এখন বলেন, ব্যাপারটা কী?’
আনিস ইতস্তত করে বলল, ‘ভূতপ্রেত বলে সত্যি কিছু আছে?’
‘এই কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?’
আনিস মুখ কালো করে বলল, ‘অনেক রকম কাণ্ডকারখানা হচ্ছে। আমি কনফিউজড হয়ে গেছি।’
‘অর্থাৎ এখন ভূতপ্রেত বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন?’
আনিস চুপ করে রইল।
‘এর কারণটা বলেন, শুনি।’
‘নানারকম শব্দ হয় ঘরে।’
‘তাই নাকি? আপনি নিজে শোনেন?’
‘জ্বি, শুনি। গন্ধও পাই, ফুলের গন্ধ।’
‘আপনি পান, না আপনার স্ত্রী পান?’
‘রানু প্রথম পায়, তারপর আমি পাই।’
মিসির আলি চুরুট ধরালেন। আনিস বলল, ‘গত রাতে ঘরের মধ্যে কেউ যেন নূপুর পায়ে হাঁটছিল।’
‘এই নূপুরের শব্দ প্রথম কে শোনে? আপনার স্ত্রী?
‘জ্বি।’
‘তারপর আপনাকে বলার পর আপনি শুনতে পান।’
‘জ্বি।’
‘আনিস সাহেব, এটাকে বলা হয় ইনডিউসড অডিটরি হেলুসিনেশন। আপনার মন দুর্বল। আপনার স্ত্রী যখন বলেন শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, তখন আপনিও তা শুনতে থাকেন। ব্যাপারটি আপনার মনোজগতে। আসলে কোনো শব্দ হচ্ছে না।’
আনিস দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনি যদি একবার আসেন আমাদের বাসায়, আপনি নিজেও শুনবেন।’
‘না ভাই, আমি শুনব না। আমি খুব শক্ত ধরনের মানুষ। খুবই যুক্তিবাদী লোক আমি।’
‘আপনি আসেন-না এক বার।’
‘ঠিক আছে, যাব।’
‘কবে আসবেন? আজ আসতে পারবেন?’
‘আমি কাল-পরশুর মধ্যে একবার যাব।
‘আমাদের বাড়িঅলার খুব সুন্দর ফুলের বাগান আছে। প্রচুর গোলাপও আছে। বিকেলের দিকে গেলে সেটাও দেখতে পারবেন।’
মিসির আলি কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘বড় ফুলের বাগান?’
‘জ্বি।‘
‘আনিস সাহেব, এমন কি হতে পারে না, বাতাসে নিচের বাগান থেকে ফুলের সৌরভ ভেসে আসে? সেই সৌরভকে আপনি একটি আধ্যাত্মিক রূপ দেন। হতে পারে?’
‘পারে, কিন্তু শব্দটা?’
‘কোনো একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। মস্তিষ্ক খুব অদ্ভুত জিনিস, আনিস সাহেব। সে আপনাকে এমন সব জিনিস দেখাতে বা শোনাতে পারে, যার আসলে কোনো অস্তিত্ব নেই। আপনি কি উঠছেন?’
‘জ্বি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, যান। আমার নিজেরও মাথা
ধরেছে। দুটো পেরাসিটামল খেয়েছি, লাভ হচ্ছে না। জ্বরও আসছে বলে মনে হয়। শরীরটা গেছে। বেশি দিন বাঁচব না।‘
- 1 মিসির আলি অমনিবাস ১ - দেবী
- 2 দেবী – ২
- 3 দেবী – ৩
- 4 দেবী – ৪
- 5 দেবী – ৫
- 6 দেবী – ৬
- 7 দেবী – ৭
- 8 দেবী – ৮
- 9 দেবী – ৯
- 10 দেবী – ১০
- 11 দেবী – ১১
- 12 দেবী – ১২
- 13 দেবী – ১৩
- 14 দেবী – ১৪
- 15 দেবী – ১৫ এখন পড়ছেন
- 16 দেবী – ১৬
- 17 দেবী – ১৭
- 18 দেবী – ১৮
- 19 দেবী – ১৯
- 20 দেবী – ২০
- 21 দেবী – ২১
- 22 দেবী – ২২
- 23 দেবী – ২৩
- 24 দেবী – ২৪ (শেষ)
Responses 0
Log in to leave a response.