সুকুমার রায়
আমাদের পোস্ট অফিসের বড়বাবুর গল্প বলার খুব শখ। যেখানেই যান—আড্ডা হোক বা দাওয়াত—তিনি গল্পের ঝুলি খুলে বসেন। সমস্যা হলো, তাঁর কাছে গল্পের সংখ্যা খুবই কম। ঘুরেফিরে সেই একই গল্প তিনি সব জায়গায় বলেন। একই কথা বারবার শুনতে কার ভালো লাগে? তাই বড়বাবুর গল্প শুনে এখন আর কেউ হাসে না, কিন্তু তাতে তাঁর উৎসাহ একটুও কমে না।
একদিন তিনি কোথা থেকে একটা নতুন গল্প জোগাড় করে এক আড্ডায় শোনালেন। গল্পটা খুব একটা মজার ছিল না, কিন্তু বড়বাবুকে সম্মান জানিয়ে সবাই একটু হাসল। বড়বাবু ভাবলেন গল্পটা বোধহয় ফাটাফাটি হয়েছে! দুইদিন পর অন্য এক দাওয়াতে গিয়ে তিনি খুব ভাব নিয়ে সেই একই গল্প আবার বললেন। যারা আগে শোনেনি, তারা একটু হাসল। বড়বাবু নিশ্চিত হলেন যে গল্পটা বেশ জমেছে।
এরপর আরও কয়েক জায়গায় তিনি সেই একই গল্প শোনালেন। মানুষজন আর হাসে না, কিন্তু বড়বাবু নিজেই নিজের গল্পে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খান। এভাবে বারবার একই গল্প শুনতে শুনতে আমাদের বন্ধু বিশু রেগে গিয়ে বলল, "আর সহ্য করা যাচ্ছে না। উনি বড়বাবু বলে মুখ বুজে আছি, কিন্তু এবার ওঁর এই গল্পের নেশা ছাড়াতে হবে।"
বিশুর বুদ্ধি
দুদিন পর আমরা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় বড়বাবু সেখানে হাজির হলেন। আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, আজ ওঁর গল্প শুনে কেউ হাসব না। বড়বাবু বসতেই বিশু টিপ্পনী কেটে বলল, "বড়বাবু, আপনার কী হয়েছে? আগে কত সুন্দর গল্প বলতেন, এখন কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছেন।" বড়বাবু এই কথায় খুব চটে গেলেন। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বললেন, "বটে? আচ্ছা দাঁড়াও, আজ তোমাদের এমন গল্প শোনাব যে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে!"
বড়বাবু তাঁর ঝুলি থেকে একে একে ৫-৭টি গল্প শোনালেন। কিন্তু আমরা সবাই গম্ভীর হয়ে মূর্তির মতো বসে রইলাম। বিশু উল্টো বলল, "নাঃ, এগুলো একদম জমল না।" বড়বাবু এবার রেগে গিয়ে বললেন, "তোমরা হাসতে জানো না, গল্পের কদর বোঝো না! এই গল্প শুনে বড় বড় সাহেবরা হাসে, আর তোমরা বলছ ভালো না?"
তখন আমাদের একজন বলল, "তা কেন? বিশুদা যখন গল্প বলে, আমরা তো খুব হাসি। আপনার গল্পগুলো আজকাল আর আগের মতো মজা হয় না।"
আসল মজা
বড়বাবু হেসেই অস্থির। তিনি বললেন, "বিশু আবার গল্প বলতে পারে নাকি? ও তো গুছিয়ে দুটো কথাই বলতে পারে না!" বিশু তখন গম্ভীর হয়ে বলল, "বলেন কী? আমার একটা গল্প শুনুন তবে—এক ছিল রাজা।"
এইটুকু শুনেই আমরা ৫-৬ জন 'হো হো' করে হাসিতে ফেটে পড়লাম। বড়বাবু অবাক! বিশু আবার বলল, "রাজার ছিল তিনটে ধাড়ি ছেলে—"
ব্যাস! আমরা সবাই মিলে এমনভাবে হাসতে শুরু করলাম যেন পৃথিবীর সবথেকে মজার কথা শুনেছি। কেউ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে, কেউ বলছে, "দোহাই বিশুদা, আর হসিও না, পেটে খিল ধরে গেল!"
বড়বাবু পুরো ব্যাপারটা দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি বুঝলেন এটা বিশুরই কারসাজি। রাগে গজগজ করতে করতে তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন।
সেই থেকে বড়বাবুর গল্প বলার শখটা অনেক কমে গেছে। এখন আর তিনি যখন-তখন গল্পের ঝুলি খুলে বসেন না।
Responses 1
Log in to leave a response.
Ahare Boro Babure to Soto Koira dilo. Uuuu aaa